দৌলতপুরের সেই ভণ্ডপীরের নতুন ভিডিও ভাইরাল, প্রশাসন নীরব

বিজ্ঞাপন

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ভণ্ডপীর আব্দুর রহমান শামীম ওরফে শামীম রেজা (৫৭) তার অনুসারীদের নিয়ে সম্প্রতি ঢাকঢোল বাজিয়ে নেচে গেয়ে উৎসব করে অাঁখি (১৭) নামে এক কিশোরের লাশ দাফনের পর এবার সেই ভণ্ডপীরের আরেকটি নতুন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভণ্ডপীর শামীমের ইসলামবিরোধী এসব কর্মকাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন এলাকাবাসী। এলাকাবাসীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জাহান বাদশাহ্ নিজেও শামীমের শাস্তি দাবি করেছেন।

মোবাইল ফোনে ধারণকৃত দুই মিনিটের এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ায় এ নিয়ে আবারো দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে এ ঘটনায় প্রশাসনের কোনো মাথাব্যথা নেই। দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশঙ্কা দেখা দিলেও সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকায় রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এখনো লিখিত অভিযোগের আশায় বসে রয়েছে প্রশাসন।

ভাইরাল হওয়া নতুন ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা গেরুয়া-পাঞ্জাবি পরা ভণ্ড শামীম নিজের আস্তানায় আয়েশি ভঙ্গিতে ফুলের মালা গলায় দিয়ে চেয়ারে বসে আছেন। চারদিক থেকে তাকে ঘিরে রেখে নারী-পুরুষরা নেচে গেয়ে ‘হরে হরে, হরে হরে, হরে শামীম, হরে শামীম’ বলে সবাই চিৎকার করছেন। শামীম একটি বড় গামলায় দুই পা ছড়িয়ে দিয়ে রেখেছেন। আর ভক্তরা দুধ দিয়ে তার পা ধুয়ে দিচ্ছেন, কেউ কেউ পায়ে চুমু খাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ হামাগুড়ি দিয়ে পায়ে মাথা ঠুকে তাকে সিজদা করছেন। এ সময় শামীম ভরাট কণ্ঠে সিজদা করা ভক্তদের উদ্দেশে কী যেন বলছেন তা ভিডিওটিতে স্পষ্ট বোঝা যায়নি।

এর আগে গত ১৬ মে বিকেলে পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের মহসিন আলীর কিশোরপুত্র আঁখি (১৭) ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার পর অাঁখির বাবা গ্রামের ভণ্ডপীর শামীমের অনুসারী হওয়ায় মরদেহ দাফনের জন্য তার হাতে তুলে দেন। ওইদিন সন্ধ্যায় তার জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ সদস্য সরওয়ার জাহান বাদশার বাড়ি একই গ্রামে হওয়ায় তিনি অাঁখির জানাজা নামাজে অংশগ্রহণ করেন। অসুস্থ থাকায় জানাজা শেষ করেই এমপি বাদশাহ্ বাড়ি চলে যান। পরে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে অাঁখির বাবা মহসিন আলী বলেন, আমরা আমাদের তরিকা অনুসারে ছেলের লাশের দাফন কাজ সম্পন্ন করবো। পীর সাহেবের (ভণ্ড শামীম) অনুসারী ছাড়া আর কারো দাফনে থাকার দরকার নেই।

এরপর রাতে ভণ্ডপীর শামীম তার ভক্ত-অনুসারীদের নিয়ে ঢাকঢোল বাজিয়ে উৎসব করে অাঁখির মরদেহ দাফন করেন। আর ইট সিমেন্ট দিয়ে তৈরি পাকা কবরে তাকে দাফনের সময় ঢাকঢোল বাজিয়ে এবং হাততালি দিয়ে সবাই সুরে সুরে বলতে থাকেন, ‘হরে শামীম, হরে শামীম, হরে হরে হরে শামীম’। আর এর মধ্য দিয়ে নেচে গেয়ে অাঁখির লাশ দাফন সম্পন্ন করেন তারা।

স্থানীয় মুসল্লিরা ইসলাম ধর্মের রীতিবিরোধী ওই শিরকি কর্মকাণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করলেও শামীম ও তার অনুসারীরা তা শোনেননি। তাদের তথাকথিত তরিকা মেনে অাঁখির মরদেহ দাফন করেন। নেচে গেয়ে মরদেহ দাফনের ওই ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দিলে সেটি ভাইরাল হয়। প্রথমের ওই ঘটনায়ও এলাকাবাসী ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন, ভণ্ডপীর শামীমের শাস্তি দাবি করেন। কিন্তু প্রশাসনের তরফে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

এদিকে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে অাঘাতের আগের ওই ঘটনার পর কয়েকদিনের মধ্যেই ভণ্ডপীর শামীমের নতুন আরেকটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হওয়ায় এলাকাবাসী আবারো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। ভণ্ড শামীমের শাস্তি দাবিতে বিক্ষোভের আয়োজন করলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় দৌলতপুর থানা পুলিশ এলাকাবাসীকে বিক্ষোভ করতে দেয়নি। অন্যদিকে শামীমের ধর্ম অবমাননা ও ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টির এসব ভণ্ডামির ব্যাপারে অবগত হয়েও পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি। তার অাস্তানাটিও স্বাভাবিকভাবে চলছে।

দুধের গামলায় দুই পা দিয়ে বসে আছেন ভণ্ডপীর শামীম আর দুধ দিয়ে তার পা ধুয়ে পায়ে মাথা ঠেকিয়ে সেজদা করা হচ্ছে। ছবি: দেশ দর্পণ

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভণ্ডপীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম রেজার বাবা মৃত জেসের মাস্টার ছিলেন স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শামীম রেজা পশ্চিম-দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রামের ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯৮৪ সালে ফিলিপনগর হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বি কম পাস করে পরবর্তীতে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এম কম পাস করেন।

পড়ালেখা শেষ করে রাজধানী ঢাকার জিনজিরা এলাকায় একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম রেজা। পরবর্তীতে ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং খাদেম হিসেবে সেখানেই থেকে যান। গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হওয়ার পর থেকে শামীম নিজের পরিবারের সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি।

২০০৭ সালে শামীম রেজা বিয়ে করেন। তবে মাস তিনেকের মধ্যেই তার দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ ঘটে। বছর দুয়েক আগে হঠাৎ করেই শামীম দৌলতপুর উপজেলার নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। তিনি নিজের বাড়িতেই আস্তানা গড়ে তোলেন। যে শামীম এক সময় জিন্সের প্যান্ট-গেঞ্জি পড়ে ঘুরে বেড়াতেন, এলাকায় ফিরে আসার পর দেখা যায় শামীমের মাথায় লম্বা চুল, মুখে লম্বা গোঁফ-দাড়ি আর পরনে সাদা গেরুয়া-পাঞ্জাবি। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া গ্রামের প্রায় দুই বিঘা জায়গা নিয়ে শামীম বসবাস শুরু করেন। এখানেই তার আস্তানা গড়ে তোলেন।

স্থানীয়রা সাংবাদিকদের জানান, শামীম এবং তার ভক্ত-অনুসারীরা নিজেদের মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিলেও তারা ইসলাম ধর্ম, আল্লাহ, নবী-রসুল কোনো কিছুকেই বিশ্বাস করেন না। শামীমের আস্তানায় দিনরাত সব সময় কমবেশি লোকজনকে আসা যাওয়া করতে দেখা যায়। প্রথমের দিকে শামীমকে এলাকার কেউ গুরুত্ব দেননি। কিন্তু দিনকে দিন তার আস্তানায় তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ ও শিশু থেকে সব বয়সী মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে। প্রায় রাতেই আস্তানায় ঢাকঢোল বাজিয়ে নাচ-গানের আসর বসতে দেখা যায়। গান-বাজনার পাশাপাশি চলে গাঁজা-ইয়াবা সেবনের আসর। বছরে দুইবার শামীমের আস্তানায় ওরশ বসে। তার শত শত ভক্ত-অনুসারী সেখানে ভিড় জমান। অনেকটা হিন্দুরীতিতে নেচে গেয়ে তারা শামীমের নাম যপতে থাকেন।

স্থানীয়রা আরো জানান, শামীমের ভক্ত-অনুসারীদের বেশিরভাগই অল্প বয়সী তরুণ-তরুণী। শামীম নিজে এবং তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অনুসারী অশিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত মানুষজনকে মগজ ধোলাই করে শিষ্যত্ব বরণে বাধ্য করেন। প্রায় দুই বছর ধরে তার আস্তানায় নাচ-গানসহ ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড চললেও মূলত গত ১৬ মে ঢাকঢোল বাজিয়ে নেচে গেয়ে উৎসব করে কিশোর আঁখির লাশ দাফন করার পর থেকে শামীম সবার মাঝে আলোচনায় চলে আসেন।

দৌলতপুর উপজেলার সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিক্ষিত ও দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত মানুষেরা এই ফিলিপনগর ইউনিয়ন থেকেই উঠে এসেছেন। কোনো সভ্য ও শিক্ষিত সমাজে এ ধরনের ভণ্ডামি মোটেও কাম্য নয়, এমনটাই মনে করছেন এখানকার সচেতন মহল। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের এসব ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধের পাশাপাশি ভণ্ড শামীমকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

গেল ১৬ মে ভণ্ডপীর শামীমের উপস্থিতিতে ঢাকঢোল বাজিয়ে নেচে গেয়ে তার অনুসারীরা কিশোর অাঁখির লাশ দাফন করেন। ফাইল ছবি

কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আ. ক. ম সরওয়ার জাহান বাদশাহ্ গণমাধ্যমকে বলেন, আমার গ্রামেই শামীমের বাড়ি। এক যুগেরও বেশি সময় শামীম নিখোঁজ ছিল। ইসলামের নামে সে আস্তানা বানিয়ে যা করছে তা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এমপি বাদশাহ্ বলেন, শামীমের বাবা এবং বড়ভাই স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। একসময় তারা খুবই ভদ্র পরিবার হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিল। শামীম ফিরে এসেছে শুনে ৪-৫ মাস আগে একদিন আমি তার বাসায় গিয়েছিলাম। কিন্তু তখনো শামীমের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমি জানতাম না। গত ১৬ মে আমার গ্রামের আঁখি নামের একটা ছেলে মারা যায়। আমি ছেলেটার জানাজায় অংশগ্রহণ করার পর দেখি দাফন করতে দেরি হচ্ছে। আমার শরীরটাও ভালো ছিল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কয়েকজন বললো, আপনি বাসায় চলে যান, আমরা দেখছি। আমি বাড়ি ফিরে গেলাম।

সরওয়ার জাহান বাদশাহ্, এমপি আরো বলেন, পরের দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম নেচে গেয়ে ঢোল-ডগর বাজিয়ে লাশ দাফন করছে শামীম ও তার লোকজন। বিষয়টি দেখেই আমি দুজন প্রতিনিধিকে শামীমের বাসায় পাঠাই, কেন সে এ ধরনের ইসলামবিরোধী জঘন্য কর্মকাণ্ড করেছে তা জানতে। শামীম আমার দুই প্রতিনিধিকে বলেছে, সে যেটা করছে সেটাই নাকি সঠিক। তার কাছে এর প্রমাণ রয়েছে। আমরা যেটা করি সেটা নাকি বেঠিক। এমপি বাদশাহ্ বলেন, শামীমের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা তার এসব ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের ঘৃণা এবং তীব্র নিন্দার পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।

দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাসির উদ্দিন বলেন, শামীমের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টি করায় ওই এলাকায় মানুষের মাঝে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে কিনা? এমন এক প্রশ্নের জবাবে ওসি নাসির বলেন, সেখানকার লোকজন মানববন্ধন করতে গিয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় আমরা মানববন্ধন করতে দেইনি। তাহলে মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে পুলিশ কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি নাসির উদ্দিন বলেন, কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি, আমরা জিডি করে রেখেছি। এ সময় ওসি নাসির বলেন, আপনি (প্রতিবেদক) নিজে আসেন অথবা লিখিত অভিযোগ দিয়ে কাউকে থানায় পাঠিয়ে দেন আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার বলেন, শামীমের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড সস্পর্কে অবগত হওয়ার পর আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে কঠোরভাবে সর্তক করে দিয়েছি। এ ঘটনায় আমাদের কাছে কেউ তার বিরুদ্ধে লিখিত কোনো অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে আমাদের পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনেকটা সুবিধা হবে।