মারাত্মক ঝুঁকিতে কুড়িল ফ্লাইওভার

ভারী যানবাহনের চাপ নিতে পারছে না বলে অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভার নিয়ে । চালু হওয়ার ১০ বছর হতে না হতেই ঝুঁকিতে পড়েছে দৃষ্টিনন্দন এ সড়কের স্থাপনাটি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিয়ারিং ও এক্সপানশন জয়েন্ট। ভারী যানবাহন চলার সময় ফ্লাইওভারে অস্বাভাবিক ঝাঁকুনির কথা জানিয়েছেন পরিবহন চালকরা। অনেক স্থানে পিচ উঠে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। মরিচা ধরেছে পাশের লোহার রেলিংয়ে। গাড়ির চাকার ঘষায় এক স্থানের পিচ অন্যদিকে সরে গিয়েছে। সেখান দিয়ে অধিক পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলো চলার সময় এপাশ-ওপাশ হেলে যাচ্ছে। অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন চলাচল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থাপনাটির আয়ুষ্কাল দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ফ্লাইওভারের উত্তরামুখী লুপে দিনের অধিকাংশ সময় যানজট তৈরি হচ্ছে। সন্ধ্যার পর ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে যানজট। রাত বাড়লে সেই যানজটে ৪০-৫০ টন পণ্য নিয়ে যোগ দিচ্ছে বড় বড় লরি। ১০-১২ টন পণ্য নিয়ে উঠে যাচ্ছে ৫ টনের ট্রাক। চলছে নির্মাণকাজের ভারী যানবাহন। যানজটে ভারী যানবাহনগুলো থেমে থেমে চলার সময় অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি হচ্ছে ফ্লাইওভারে। এদিকে সন্ধ্যার পরই ১৪ লেনের ৩০০ ফুট এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ঢাকার বাইরে থেকে ঢুকছে হাজার হাজার মালবাহী ট্রাক। ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে যেতে এসব যানবাহন উঠছে ফ্লাইওভারে। অধিকাংশ ট্রাকই অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই। একজন ট্রাকচালক জানান, তিনি টঙ্গী থেকে রূপগঞ্জ নিয়মিত যাতায়াত করেন। দুই বছর আগে ফ্লাইওভারে এমন ঝাঁকুনি দেখেননি। এখন ভয় লাগে। বিকল্প রাস্তা না থাকায় ফ্লাইওভারে ওঠেন। এদিকে শোভন নামে এক প্রাইভেট কোম্পানির কর্মকর্তা বলেন, তিনি মাঝেমধ্যে রাতে নিজের গাড়ি চালিয়ে গাজীপুর থেকে রামপুরা বাসায় ফেরেন। ফ্লাইওভারে অতিরিক্ত পণ্যবাহী ট্রাকগুলো চলার সময় এদিক-ওদিক দোল খায়। ভয় হয় কখন উল্টে গাড়ির ওপর পড়ে।

> স্পেসএক্সে চাকরি পেল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কিশোর
> চলছে বরিশাল ও খুলনায় ভোটগ্রহণ

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুজ উদ্দিন খান বলেন, ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ ওজনের গাড়ি চলাচল করে ফ্লাইওভারে। বিশেষ করে বালু ও পাথরবোঝাই ট্রাকগুলো চলাচল করার কারণে ফ্লাইওভারটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। কারণ এসব মালবোঝাই ট্রাকগুলো অতিরিক্ত ওজন বহন করে। ইতোমধ্যে ফ্লাইওভারের এক্সপানশন জয়েন্ট ও বিয়ারিং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। ফ্লাইওভারটি এখন ঝুঁকির দিকে চলে যাচ্ছে।

এদিকে ফ্লাইওভার নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটা লোড মানদন্ড মেনে এসব স্থাপনা ডিজাইন করা হয়। নির্ধারিত লোডের যানবাহন চললে ফ্লাইওভারের ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তবে বাংলাদেশে ১৬ টনের গাড়িতে অনায়াসে ২২-২৩ টন মালামাল বহন হচ্ছে। চালু ও ব্রেক করার সময় এসব ভারী যানবাহনের চাকার ঘষায় সড়কের পিচ সরে যাচ্ছ। নিচের রাস্তা দেবে গেলে সহজে ঠিক করা যায়। ঝুলন্ত রাস্তার স্ট্রাকচার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুলতে থাকে। বিয়ারিং ও রাবার দ্রুত নষ্ট হয়। মেঘনা ব্রিজে আমরা সেটা দেখেছি। তখন এটা মেরামত কঠিন। এজন্য ফ্লাইওভারগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। অতিরিক্ত লোডের গাড়ি আটকাতে হবে। কিন্তু এখানে একটা স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ করে দীর্ঘমেয়াদে চালানোর মানসিকতা নেই। তিনি বলেন, এখনো তো ঢাকা বাইপাস ও পূর্বাচল নতুন শহর চালু হয়নি। এগুলো চালু হলে ফ্লাইওভারের ওপর চাপ আরও বাড়বে। তবে ঝুঁকির বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে কুড়িল ফ্লাইওভারের প্রকল্প ডিজাইনার ড. আজাদুর রহমান বলেন, আমেরিকার এইচ-২ ফরমুলা মেনে এইচএল-৯৩ ওজনক্ষমতা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়েছে। সড়ক দিয়ে যেসব গাড়ি চলতে পারবে, ফ্লাইওভার দিয়েও পারবে। গত ১০ বছরে এ ফ্লাইওভারে ওজন ক্ষমতা নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। আশা করি আর হবে না। তিনি আরও বলেন, ফ্লাইওভারে গাড়ি উঠলে কম্পন হবেই। ডিজাইন ওইভাবে করা হয়েছে। পদ্মা সেতু, যমুনা সেতুসহ সব সেতুতে কম্পন হয়। এটা ঝুঁকি নয়।

রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল হুদা বলেন, যে ডিজাইন করা হয়েছে তা আমরা ক্রস চেক করেছি। কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফ্লাইওভারের ধারণক্ষমতার কোনো সমস্যা হবে না। প্রসঙ্গত, উত্তরা, টঙ্গী, গাজীপুর, মিরপুর, বনানী, বারিধারা, গুলশান, রামপুরা ও বনশ্রীর যানজট সমস্যার সমাধানে ৩০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ কুড়িল ফ্লাইওভার। ২০১৩ সালের ৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন করেন। এর চারটি লুপ দিয়ে বনানী, কুড়িল, খিলক্ষেত ও পূর্বাচল প্রান্তে ওঠানামা করা যায়। ফ্লাইওভারটি নির্মাণের ফলে রাজধানীতে প্রবেশেরও আরেকটি দ্বার উন্মোচিত হয়। কাঞ্চন ব্রিজ, সিলেট বাইপাস হয়ে ৩০০ ফুট পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ঢাকা শহরে প্রবেশ করতে পারছে যানবাহন। সহজ হয়েছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যাতায়াত। রাজউকের নিজস্ব তহবিল থেকে নির্মিত ফ্লাইওভারটির রক্ষণাবেক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরকে বুঝিয়ে দেয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। রাজধানীর সড়কব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ ফ্লাইওভারটির অবস্থা এখন নাজুক। ঢাকার উত্তর-দক্ষিণে চলাচলকারী যানবাহনের পাশাপাশি ১৪ লেনের ৩০০ ফুট এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে আসা ঢাকার বাইরের হাজারো যানবাহনের চাপ নিতে পারছে না ৩০.১৮ ফুট প্রস্থের ফ্লাইওভারটি। সেই সঙ্গে সক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই ভারী যানবাহন ফ্লাইওভারকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।বিজ্ঞজনের মতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পূন্যবাহী পরিবহন গুলোকে আটকে দিতে হবে।

জুন ১২, ২০২৩ at ১৩:২৬:০০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আক/মোরইমি/ইর