বাজেটে কেউ খুশি নয়

ছবি- সংগৃহীত।

প্রতিটি নির্বাচনী বছরের বাজেটে ভোটারদের খুশি করতে নানা খাতে থাকে করছাড়। প্রাপ্তির মাত্রাও থাকে বেশি। কিন্তু এবার ভোটারদের তুষ্ট করার মতো ভোটারবান্ধব বাজেট করতে পারেনি সরকার। আইএমএফের সঙ্গে সরকারের ঋণ চুক্তির কারণে বাজেটে সাধারণ মানুষ সুবিধা পায়নি। উল্টো বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বেড়েছে। প্রস্তাবিত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে এমন মন্তব্য ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের। তবে আইএমএফকে খুশি করার মতো তেমন কিছু চোখে পড়েনি বলে মনে করছেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেছেন, বাজেটে আসলে কাকে খুশি করা হলো- খুঁজে পাচ্ছি না। আবার ব্যবসায়ীরাও বলছেন, তারাও খুশি নন। সুতরাং বাজেটে কে খুশি হলো আমি খুঁজে পাচ্ছি না।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, চলমান বৈশ্বিক সমস্যা ও দেশের কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে আমরা অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক ভারসাম্যের ওপর চাপের মতো কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বাজেটের অগ্রাধিকার হচ্ছে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি হলো বাংলাদেশ এখন আইএমএফের যে শর্তগুলো মোকাবিলা করছে তার বেশির ভাগই বাজেটের সঙ্গে সম্পর্কিত। তৃতীয় প্রেক্ষাপট হলো মানুষের জীবনযাত্রার খরচ ও ব্যবসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কঠিন পর্যায়ে রয়েছে। এদিকে বাজেটে ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগ দাবিই পূরণ হয়নি। বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, ডিসিসিআই এবং বিসিআইসহ বাণিজ্য সংস্থাগুলো প্রস্তাবিত বাজেটে রপ্তানির ওপর উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছিল। তাদের মতে, আগামী পাঁচ বছর এটি এমনই থাকা উচিত। এছাড়া, বাজেট করপোরেট ট্যাক্স কমানো ও অন্যান্য করসম্পর্কিত সুবিধা এবং চাহিদা পূরণ করেনি। বাজেটপরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন সংগঠনের দাবিগুলো তুলে ধরা হয়েছে-

আরো পড়ুন :
> গাজীপুরে চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যার বিচারের দাবীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ
> ৮৬ কোটি ডলার ঋণ দিলো বিশ্বব্যাংক

বাজেটে বস্ত্র, রপ্তানি ও এসএমই খাতের জন্য তেমন কিছু নেই : প্রস্তাবিত বাজেটে বস্ত্র, রপ্তানি ও এসএমই খাতের জন্য তেমন কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। মেন মেইড ফাইবার থেকে ভ্যাটসহ সব ধরনের কর প্রত্যাহার, রপ্তানিতে উৎসে কর শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ নির্ধারণ এবং আমদানি করা কাঁচামালে তিন শতাংশ আগাম কর রহিত করার আবেদন জানায় সংগঠনটি।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, প্রাক্কলিত টার্নওভার ও প্রবৃদ্ধির আলোকে বাস্তবভিত্তিক রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। এতে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য মাত্রাতিরিক্ত করভার এবং ভোক্তারা মূল্যস্ফীতি থেকে রেহাই পাবেন। শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আর্থিক বরাদ্দের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন তিনি।

করপোরেট করের হার কমানো উচিত : অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর্থিক নীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে যথাযথ সমন্বয় থাকা উচিত বলে মনে করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি মো. সামির সাত্তার। তিনি বলেন, করের আওতা বাড়াতে হবে।

আমদানির বিকল্প আছে এমন শিল্প এগিয়ে নেয়ার দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, এর ফলে উৎপাদনকারীরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করতে পারবেন। এসব শিল্প বাংলাদেশকে আমদানি করা জিনিসের চাহিদা কমাতে ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

করপোরেট করের হার কমানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এনবিআর নামমাত্র করপোরেট করের হার কমাচ্ছে। তবে, করপোরেট করের হার কমানোর উদ্যোগ নেয়া উচিত। জরুরি ও নিত্যপণ্য এবং কারখানার জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করতে ঋণপত্র খুলতে সহায়তার জন্য মার্কিন ডলারের আলাদা ফান্ড তৈরির গুরুত্বের কথাও বলেন তিনি।

বাজেটের তথ্যও অসম্পূর্ণ : বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বাজেটে ব্যবসার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় বাজেটের তথ্যও অসম্পূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে শিল্পের দক্ষতা এবং নির্মাতাদের প্রতিযোগিতামূলকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাজেটে এ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এটি অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়নি। একইভাবে ৬ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি ধরে রাখারও নীতি কৌশল নেই।

সুবিধা পায়নি বিজিএমইএ: বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম জানান, বাজেটে তারা কিছু সুবিধা দাবি করলেও তা মেলেনি। করপোরেট ট্যাক্স, ট্যাক্সের উৎস, অন্যান্য কর সবই অপরিবর্তিত রয়েছে। তিনি বলেন, যদিও আমরা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও মহামারিপরবর্তী অবস্থান থেকে শিল্পের পরিবর্তনের বিষয়ে এটি দাবি করেছি। একটি দেশের প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে শিল্প উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে।

আবাসনে চুক্তিমূল্যের ট্যাক্স কমানো উচিত : রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রথম) কামাল মাহমুদ বলেন, এবার বাজেট প্রস্তাবের পর অসংখ্য নাগরিকের ফ্ল্যাটের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। তিনি বলেন, আবাসন ব্যবসায়ীরা চুক্তিমূল্যের ট্যাক্স ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। একটা সময় ১৫ শতাংশ ট্যাক্স ছিল, তখন জমি-ফ্ল্যাট বিক্রি অনেক কমে গিয়েছিল। নতুন করে ৪ শতাংশ ট্যাক্স বাড়ানোতে এ খাতে স্থবিরতা নেমে আসবে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে রেজিস্ট্রেশন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সিমেন্ট, পাথর, টাইলস, লিফট, সিরামিক, গ্লাস, সুইচ-সকেট, ক্যাবল, কিচেনওয়্যারসহ কমপক্ষে ১২-১৩টি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

পুঁজিবাজারের জন্য নতুন কিছু নেই : দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে নতুন কিছু না থাকায় হতাশা ব্যক্ত করে আগের দাবিগুলোই পুনরায় তুলে ধরেছেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ মো. হাসান বাবু বলেন, বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য নতুন কোনো কিছু আরোপ করা না হলেও কোনো প্রণোদনাও দেয়া হয়নি। আমাদের ছয়টি প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করার জন্য দাবি জানাচ্ছি। এগুলো হচ্ছে- তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর হার ব্যবধান ১০ শতাংশ করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের দেয়া লভ্যাংশের ওপর দ্বৈতকর প্রত্যাহার করে বন্ডের ওপর কেটে রাখা অগ্রীম করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করা, শেয়ার লেনদেনে কর শূন্য দশমিক ০১৫ শতাংশ করা এবং এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর ব্যবধান ১০ শতাংশ করা ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে নামিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন তিনি।

কার্বন কর অযৌক্তিক : প্রস্তাবিত বাজেটে কার্বন কর আরোপের বিষয়টি মোটেই যৌক্তিক নয় বলে মন্তব্য করেছে গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডা। সংগঠনের সভাপতি মো. হাবিব উল্লাহ্ ডন বলেন, আগামী অর্থবছর থেকে একাধিক গাড়ি থাকলে গুনতে হবে কার্বন কর। তবে অনেকেই বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। যেগুলো পরিবেশবান্ধব। এক্ষেত্রে গ্রাহককে কেন কর দিতে হবে?

তিনি বলেন, এছাড়া বারভিডা জাপান থেকে সর্বাধিক প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং পরিবেশবান্ধব গাড়ি আমদানি করে। এসব গাড়ি থেকে কার্বন নিঃসরনের সুযোগ নেই। তাই প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী এসব গাড়ির ব্যবহারকারীদের পরিবেশ সারচার্জ বা কার্বন কর দেয়ার বিষয়টি মোটেই যৌক্তিক নয়।

তিনি বলেন, প্রস্তাব অনুযায়ী সিসি স্ল্যাব ও সম্পূরক শুল্ক কমানো হলে এসব গাড়ি আমদানি বাড়ানো ও সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতো। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

জুন ০৮, ২০২৩ at ১০:৩০:০০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আক/দেপ্র/ইর