পেঁয়াজে একদিনে ১৬ কোটি টাকা মুনাফা!

ছবি- সংগৃহীত।

কৃষকের উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে পেঁয়াজের আইপি (ইমপোর্ট পারমিট) অর্থাৎ আমদানি অনুমতি বন্ধ করে দেয় সরকার। ফলে ১৬ মার্চ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এ সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে থাকে এই পণ্যটির। গত ৪ জুন হঠাৎ করেই মাত্র একদিনের ব্যবধানে খুঁচরা বাজারে ২৫ টাকা বেড়ে সেঞ্চুরি হাকায় পেঁয়াজের দাম।

তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। এক মাসের চাহিদা ২ লাখ টন। আর একদিনের চাহিদা ৬ হাজার ৬৬৬ টন বা ৬৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৬ কেজি। সে হিসেবে সিন্ডিকেট করে গ্রাহকের পকেট থেকে একদিনেই ১৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা তুলে নেয় ব্যবসায়ীরা। এরপরেই আমদানির অনুমতি দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। আমদানি ঘোষণার পর গত দুই দিনে পণ্যটির দাম পাইকারি ও খুচরা বাজারে ম্যাজিকের মতো কমে যায়।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার কৃষি মন্ত্রণালয় ২১০টি আইপি অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে ৪ লাখ ৩৩ হাজার টন পেঁয়াজ আসার কথা রয়েছে। এরপর থেকেই বেনাপোল, হিলি ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে ট্রাকে ট্রাকে পেঁয়াজ ঢুকছে বাংলাদেশে।

> বার্সেলোনায় ফিরছেন মেসি!
> আমাদের এত কম বয়সী দেখাচ্ছে কেন!

কৃষি বিভাগের দাবি, দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় এবং কৃষকদের কথা ভেবে গত ১৫ মার্চ থেকে সরকার ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে দেয়। ফলে পরদিন ১৬ মার্চ থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এই সুযোগকে কাজে লাগায় মজুতকারী সিন্ডিকেট। হু হু করে বাড়তে বাড়তে মসলা জাতীয় পণ্যটির দাম ভোক্তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। সরকার পেঁয়াজের বাজার মনিটরিং করেও তা রুখতে পারেনি। এরপর গত রবিবার হঠাৎ করেই সেঞ্চুরি হাকায় পেঁয়াজ। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে ওইদিনই কৃষি মন্ত্রণালয় ২১০টি আইপি অনুমোদন করেছে।

জানা গেছে, পেঁয়াজ আমদানির অনুমতির প্রথম দিন গত সোমবার দেশের তিনটি স্থলবন্দর দিনাজপুরের হিলি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ ও সাতক্ষীরার ভোমরা দিয়ে ১ হাজার ৪০৭ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। এসব পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে গড়ে প্রায় সাড়ে ১৫ টাকা কেজিতে। ৯ জন ব্যবসায়ী প্রথম দিন এসব পেঁয়াজ আমদানি করেন।

তিন স্থলবন্দরের কাস্টমস স্টেশনের তথ্যে দেখা যায়, প্রতি চালানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১৩ থেকে ১৬ সেন্টে। ডলারের বিনিময় মূল্য ১০৮ টাকা ১৭ পয়সা ধরে মানভেদে আমদানি মূল্য দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৭ টাকা ৩০ পয়সা। গড়ে দাম পড়ে কেজি প্রতি প্রায় সাড়ে ১৫ টাকা। প্রতি কেজিতে কর ভার গড়ে সাড়ে ৩ টাকা। এ হিসাবে শুল্ক-করসহ পেঁয়াজ আমদানিতে খরচ পড়ে প্রায় ১৯ টাকা।

হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি ও খান ট্রেডার্সের কর্ণধার হারুন-উর রশীদ বলেন, গরমের কারণে পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে বেশি। সবকিছু ধরেও প্রতি কেজি ২৫-৩০ টাকার কাছাকাছি খরচ পড়তে পারে। ভোক্তা পর্যায়ে এই পেঁয়াজের দাম ৪০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ খান জানান, প্রতি টন পেঁয়াজ ২২০ মার্কিন ডলার থেকে ২৫০ মার্কিন ডলারে আমদানি করা হচ্ছে। এভাবে কয়েক চালান পেঁয়াজ দেশে এলে খোলা বাজারে পেঁয়াজের মূল্য ৩০-৩৫ টাকার ভেতর থাকবে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আবদুল মাজেদ বলেন, মঙ্গলবার পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩০ টাকা করে কমে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জেও পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচা বাজারে মঙ্গলবার পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল প্রতি কেজি ৯০ টাকায়। গত সোমবার পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায়। সেগুনবাগিচা থেকে রামপুরা ও খিলগাঁও বাজারে পেঁয়াজের দাম আরো ৫ টাকা কম। সেখানে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়। রামপুরা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রেতা এনামুল হক বলেন, আগে কেনা পেঁয়াজ এখনো বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ পেঁয়াজগুলো শনিবারে ৯২ টাকায় কেনা। কিন্তু এখন পাইকারি বাজারে দাম কম। সে কারণে বাধ্য হয়ে লোকসান দিতে হচ্ছে।

জানা গেছে, ঢাকার মসলাজাতীয় পণ্যের পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র শ্যামবাজারে গত সোমবার একদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিপ্রতি ২৫ টাকা। সেখানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়, যা রবিবার ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পেঁয়াজ আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করায় বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে প্রচুর পেঁয়াজ আসছে। কাল-পরশুর মধ্যে এ পেঁয়াজগুলো পাইকারি বাজারে এসে পৌঁছাবে। তখন দাম আরেক দফা কমবে।

শ্যামবাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, শুধু পাইকারি বাজারে নয়, আমদানির খবরে দেশের গ্রামাঞ্চলের মোকামেও পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। শ্যামবাজারে পেঁয়াজের দাম সাধারণত দ্রুত ওঠানামা হয়। অন্য পাইকারি বাজারে প্রভাব পড়ে একটু দেরিতে। খুচরা বাজারে এর প্রভাবে থাকে দীর্ঘসূত্রতা। বিক্রেতারা বেশি দামে কেনা পণ্য পাইকারিতে কমলেও দাম কমাতে চান না। যদিও কোনো পণ্যের দাম বাড়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গে তারা দাম বাড়িয়ে দেন।

জুন ০৭, ২০২৩ at ১২:৪২:০০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আক/দেপ্র/ইর