তিন দফা দাবিতে জাবি শিক্ষার্থীর ১৫০ ঘন্টা অনশন

গণরুম বিলুপ্তি, আবসিক হল থেকে অছাত্রদের বের করা ও বৈধ ছাত্রদের সিট সুনিশ্চিত এর দাবি নিয়ে গত বুধবার (৩১ মে) থেকে অনশন করছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের এবং মীর মশাররফ হোসেন হলের ৪৯ তম আবর্তন এর আবাসিক ছাত্র সামিউল ইসলাম প্রত্যয়।

দাবির বিষয়ে প্রত্যয় বলেন, গণরুমে অসংখ্য শিক্ষার্থী কষ্টে দিনাতিপাত করছে। অথচ হলে অছাত্ররা অবস্থান করছে, প্রশাসন তাদের বের করার বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

সামিউলের অনশন শুরু দিন থেকে হল প্রাধ্যক্ষ ও ওয়ার্ডেন এসে তার দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। সাথে তাকে হলে একটি আসন নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেন। তারপরেও তিনি অনশন বন্ধ না করায় পরে শুক্রবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল আলম এসে দাবিগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। তবে তাতেও সামিউল না মানলে উপাচার্য পরে সে স্থান ত্যাগ করেন।

আরো পড়ুন :

> পত্নীতলায় পাঁচ ডাকাত আটক
> মদনে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত

দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসের পরেও অনশন বন্ধ না করার ব্যাপারে প্রত্যয় বলেন, আমি গত এক বছর ধরে প্রশাসনকে হলের সমস্যাগুলো নিয়ে জানিয়ে আসছি। হল প্রশাসন এগুলো দ্রুত সমাধান করবে বলে প্রতিবারই আশ্বাস দিয়ে আসছে। অনেক আশ্বাস পেয়েছি, এবার এর বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমি অনশন ভাঙবো না। আমার এই অনশন চালিয়ে যাবো।

প্রত্যয়ের দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শনিবার (৩ জুন) সন্ধ্যা ৭ টায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনের মাঠ থেকে থেকে শুরু হয়ে ছাত্রী হলগুলো প্রদক্ষিণ করে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে এসে শেষ হয়। এসময় শিক্ষার্থীরা সামিউলের দাবির বাস্তবায়নের জন্য উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয়।

বিক্ষোভ শেষে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক আলিফ মাহমুদ বলেন, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের আসন দিতে ব্যর্থ জাবি প্রশাসন। গণরুমগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত র‌্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছে। হলগুলোতে আসন সংকট চরমে, অথচ অছাত্রদের হল থেকে বের করছে না প্রশাসন। প্রত্যয় যে দাবি নিয়ে অনশনে সেই দাবি জাবির সকল শিক্ষার্থীর। কিন্তু এই দাবি ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে যাবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা মেনে নিতে গড়িমসি করছে। প্রশাসন অছাত্রদের বের করতে সাহস পাচ্ছে না।

এদিকে রবিবার (৪ জুন) প্রত্যয়ের অনশনে সংহতি জানিয়েছেন প্রগতিশীল এবং বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা।

এসময় কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক বলেন, তার দাবিটি যৌক্তিক এবং তার দাবিকে আমি সমর্থন করি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট সংকট থাকার কারণে যে গণরুম ব্যবস্থা এবং প্রাক্তন ছাত্রদের যে হলে অবস্থান এটার একটা সমন্বয় না করা পর্যন্ত আজকে সে অনশন করছে, কালকে আরো অনেকে অনশন করবে।

সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামছুল আলম সেলিম প্রত্যয়ের তিনটি দাবিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি উল্লেখ্য করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দ্রুততর সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানান।

দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, আমি প্রত্যয়ের দাবিগুলোর সাথে সংহতি জানাচ্ছি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি তীব্র ক্ষোভ জানাচ্ছি। কারণ আজকে প্রত্যয় যে জায়গায় এসেছে, তার জীবনকে বাজি রেখেছে, তার আগে সে অনেক ধাপ পার হয়ে এসেছে। হলে যে নির্যাতন হয় তার বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন হয়েছে। প্রশাসন তাও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সরকারি ছাত্র সংগঠনের লাঠিয়াল তৈরি করার জন্য এই গণরুম টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। এজন্য তীব্র ক্ষোভ জানাচ্ছি প্রশাসনের প্রতি। আমি মনে করি যে এই দাবিগুলো যৌক্তিক এবং প্রত্যয়ের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওর এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হচ্ছি।

সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য নূরুল আলম বলেন, প্রত্যয়ের দাবিগুলো যৌক্তিক। তবে এসব বাস্তবায়নের জন্য সময় প্রয়োজন। আমরা ইতোমধ্যে গণরুম বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়েছি। নতুন হল চালু হলে গণরুম আর থাকবে না এবং সব ছাত্রের সিট নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আর অছাত্রদের বের করার জন্য নোটিশ দিয়েছি। আবারও আমরা হল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অছাত্রদের বের করার ব্যাপারে জোর দেবো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান বলেন, আমরা দাবি মেনে নেয়ার ব্যাপারে তাকে আশ্বস্ত করেছি। তাকে রুমে দেওয়ার চেষ্টা করছি। তার বাসায় ফোন করেছি। কিন্তু সে কোনোকিছুতেই মানছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি নাজমুল হাসান তালুকদার বলেন, ‘উপাচার্য স্যারের নির্দেশে হলগুলোতে অবস্থানরত অছাত্রদের তালিকা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমার হলের আংশিক তালিকা হয়েছে। তবে অন্য হলগুলোর বিষয়ে প্রাধ্যক্ষদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবো।’

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রত্যয়ের অনশনের প্রায় ১৫০ ঘন্টা পার হয়েছে। এর আগেও একই দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন এবং দাবি আদায়ে প্রভোস্ট, প্রক্টর ও উপাচার্য বরাবর কয়েক দফায় লিখিত আবেদন করে আসছিলেন বলেও জানান প্রত্যয়। এদিকে আজও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়ায় গ্লুকোজ স্যালাইন নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন সামিউল ইসলাম।

জুন ০৫, ২০২৩ at ১৮:২৪:০০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আক/নাউ/ইর