বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পনায় গলদ

ছবি- সংগৃহীত।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানের নাজুক পরিস্থিতির জন্য নীতিনির্ধারকদের ভুল নীতি দায়ী। বিদ্যুৎ খাতকে ‘বাণিজ্যিক’ বিবেচনায় না নিয়ে ‘সেবা খাত’ হিসাবে মূল্যায়ন করতে হবে। এই খাতের উন্নয়ন করতে গিয়ে কোথায় ভুল হয়েছে তা খুঁজে বের করতে হবে। সব পরিকল্পনা রিভিউ করতে হবে। তাহলেই বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার গলদ বেরিয়ে আসবে।

সম্প্রতি ভোরের কাগজ তিনি এসব কথা বলেন। অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের জন্য পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা নেয়া হয়নি। বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপে গলদ আছে। এখন সবকিছু রিভিউ করার সময় এসেছে। কাজ করতে গেলে সরকারের পক্ষে বিপক্ষে কথা হবেই, আমি সেগুলো ইঙ্গিত করতে চাই না। তবে আমরা কিছুটা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছি।

আরো পড়ুন :
> গোপালগঞ্জে জাল টাকা ও টাকা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেফতার-২
> দাবদাহে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ

তিনি বলেন, বাজেটে জ্বালানি খাতের উন্নয়নে টাকা থাকে না। সিংহভাগ টাকা বিদ্যুৎ খাতে দিয়ে উৎপাদন, বিতরণ, সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়ানো জন্য ব্যয় হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সম্পদ সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না। এতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। এই খাতকে বাণিজ্যিক খাত হিসাবে ব্যবহার করতে গিয়ে, আইন তৈরি করে প্রতিযোগীতাহীন করে, এই খাতের ব্যয় চরমভাবে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যায় অযৌক্তিক ব্যয়, লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বন্ধ করে সম্পূর্ণ সেবা খাত হিসাবে বিবেচনায় নিতে রিভিউ প্রয়োজন। এখন যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সবকিছু দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে অন্য খাতের ব্যয় কাঁটছাট করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে জীবনযাত্রা সচল থাকবে, অর্থনীতি সচল থাকবে, সরকারে ভ্যাট-ট্যাক্স আয় ঠিক থাকবে। আর লোডশেডিং থাকতেই পারে, সংসাবে অভাব থাকলে তা সদস্যদের সমতাভিত্তিক হতে হবে। কিন্তু বৈষম্য হলে অসন্তোষ গ্রাস করে ফেলবে।

অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, আমাদের মতো দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের দেশে সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অপচয় ও অপব্যয়ের পরিচয় দিয়েছি। সাধ্য ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে কাজ করিনি। যদি ১০ শতাংশ রেটে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হয়, তাহলে সেটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে। ১০ বছর ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু এই পরিকল্পনায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে। জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা বিদেশিদের কাছ জিম্মি হয়ে গেছি। বিদেশিরা রপ্তানির সুযোগ চায়। তাদের অব্যাহতভাবে রপ্তানির সুযোগ দেয়া হলে আমাদের নাইজেরিয়া বানিয়ে ফেলবে। সেটা আমরা কখনো ভাবিনি, আমাদের সক্ষমতাও তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ালেই দামের ক্ষেত্রে টানাপড়েন বাড়বে, আমরা ভূরাজনীতির শিকার হব। এসব চিন্তা না করে রপ্তানি নির্ভর হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের রক্ষণশীল হওয়ার প্রয়োজন ছিল। সরকার খাদ্য নিরাপত্তায় সফল হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সরকারের বলিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল।

দেশীয় কয়লা উত্তোলন প্রসঙ্গে শামসুল আলম বলেন, দেশীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল। উন্মুক্ত পদ্ধতির বিরুদ্ধে মানুষ বাঁধা দিয়েছে। ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হয়ে আসছে। এখন সারাবিশ্বে আরো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলন হচ্ছে। এখন পরিবেশ সম্মতভাবে কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব। আমরা কোম্পানি করলাম, কিন্তু সেই কয়লা উত্তোলন করলাম না। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য বাপেক্সকে টাকা দিলাম, কিন্তু গ্যাস উত্তোলন না করে বিদেশিদের ওপর নির্ভর করলাম-এভাবে চলবে না।

জুন ০৫, ২০২৩ at ১০:৩৩:০০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আক/দেপ্র/ইর