জাবিতে দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত শিক্ষকের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার আয়োজন চলছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা কেন্দ্রের সামগ্রী কেনাকাটায় দুর্নীতি করার অভিযোগে বরখাস্ত পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খবির উদ্দিনের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরিফ এনামুল কবিরের ‘চাপে’ এমন আয়োজন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অধ্যাপক খবির উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের’ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৯ সালে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বিরোধী আন্দোলন চলাকালে তিনি সামনের সারি থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এছাড়া তিনি সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবিরের অনুসারী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধ্যাপক খবির উদ্দিন ২০১৭-১৮ সালে ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ছিলেন। তখন প্রায় দুই লাখ টাকার কেমিক্যাল ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা কেন্দ্রের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক এ এ মামুন এ অভিযোগ তুলেন। তার প্রেক্ষিতে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক খবির উদ্দিনকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের প্রশাসন। এছাড়া অধিকতর তদন্তের স্বার্থে ছয় সদস্যের স্ট্রাকচার্ড কমিটি গঠন করা হয়।

অভিযোগপত্রের তথ্য মতে, অধ্যাপক খবির উদ্দিন ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা কেন্দ্রের জন্য টেক টাচ সায়েন্স অ্যান্ড সিনার্জি লিমিটেড (টিটিএসএসএল) থেকে দুটি কেমিক্যাল ক্রয়ের ব্যয় দেখান ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ যার আরএফকিউ কর্তৃক গৃহীত মূল্য মাত্র ৪ হাজার ৪২৯ টাকা। এছাড়া ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা কেন্দ্রের জন্য মেসার্স সাহাবউদ্দিন আহমেদ এন্ড কোম্পানী থেকে ১ কোটি ৬৪ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের একটি যন্ত্র ক্রয় করা হয়। তবে যন্ত্রটি স্থাপনের সময় ত্রুটি দেখা দিলেও ইনস্টলেশন সার্টিফিকেট প্রদান করেন অধ্যাপক খবির উদ্দিন।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা প্রজেক্টের জন্য অধ্যাপক খবির উদ্দিন নিজের বায়োডাটা প্রদান করেন, যেখানে তিনি স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রদত্ত সার্টিফিকেট অনুযায়ী, অধ্যাপক খবির উদ্দিন দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধ্যাপক পদমর্যাদার একজন শিক্ষক বলেন, ‘অধ্যাপক খবির উদ্দিন কয়েকজন শিক্ষককে বলেছিলেন, শরীফ এনামুল কবিরের নির্দেশনায় তার পছন্দের কোম্পানি থেকে ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণাগারের সকল কেনাকাটা করেছিলো। এছাড়া ১ কোটি ৬৪ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকার যন্ত্রটি নষ্ট জেনেও সচল সার্টিফিকেট প্রদান করেছিলো শরীফ এনামুল কবিরের নির্দেশে।

তথ্য মতে, আগামীকাল রবিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ সভায় অধ্যাপক খবির উদ্দিনের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। ফলে ‘তড়িঘড়ি’ করে সিন্ডিকেট সভার আগে আজ শনিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্ট্রাকচার্ড কমিটির মিটিং ডাকা হয়েছে। যাতে স্ট্রাকচার্ড কমিটি অধ্যাপক খবির উদ্দিনের পক্ষে সুপারিশ পাঠাতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলমের উপাচার্য হওয়া পেছনে শরীফ এনামুল কবিরের সহযোগিতা রয়েছে বলে মনে করেছেন শিক্ষকরা। তার প্রেক্ষিতে শরীফ এনামুল কবিরের নির্দেশনা অনুযায়ী অধ্যাপক মো. নূরুল আলম সকল কাজ করছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেন, ‘অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরিফ এনামুল কবিরের সঙ্গে আতাঁত করে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। যেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ভালোভাবে নিচ্ছে না। এছাড়া স্ট্রাকচার্ড কমিটিতে শরীফ এনামুল কবিরও আছেন, কমিটি গঠনের সময় সিন্ডিকেটে তিনি নিজের নাম নিজেই প্রস্তাব করেন। যেহেতু অধ্যাপক খবির উদ্দিন শরীফ এনামুল কবিরের অনুসারী, সেহেতু স্ট্রাকচার্ড কমিটির সিদ্ধান্ত খবির উদ্দিনের পক্ষে যাবে বলে আশংঙ্কা করছি।’

এ বিষয়ে ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক এ এ মামুনের মুঠোফোনে ফোন দিয়ে তার ফোন ব্যস্ত পাওয়া যায়। পরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি আর রিসিভ করেননি।

অধ্যাপক খবির উদ্দিনের চাকরি ফিরিয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কোন ‘চাপ’ দিচ্ছেন কিনা- এ বিষয়ে জানতে অধ্যাপক শরিফ এনামুল কবিরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, ‘মিটিং একটু পরে শুরু হবে। খবির উদ্দিন পুনরায় আসবেন নাকি আসবেন না, সেসব বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। সুপারিশ করা হবে কিনা- সেটা মিটিংয়ে পর্যালোচনা না করে বলতে পারিনা। আর এখানে কারও কোন চাপ নেই।’

সেপ্টেম্বর ১৭,২০২২ at ১৬:২৯:০০ (GMT+06)
দেশদর্পণ /আক /নর /শই