প্রসঙ্গ : কাউন্টার নিউজ ও সিন্ডিকেট

লেখক : এস আর সেলিম
বিজ্ঞাপন

ফেসবুক মেসেঞ্জারে আসা স্থানীয় কয়েকটি দৈনিকের প্রিন্ট ভিউ দেখছিলাম। একটা ‘গুরুত্বপূর্ণ খবর’ দেখে পড়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ই-পেপার অথবা খবরের লিঙ্ক না থাকায় পড়তে সমস্যা হচ্ছিল। প্রিন্ট ভিউতে শুধু খবরের শিরোনাম দেখা যায়। মোবাইলের স্ক্রিন টেনেটুনে অক্ষর কিছুটা বড় করা গেলেও ঝাপসা দেখাচ্ছিল। ওই অবস্থায় ‘খবরটা’ দেখে বিষয় সস্পর্কে মোটামুটি অনুমান করা গেল। পুরোপুরি পড়ার জন্য ইনবক্সে এক ছোট ভাইকে রোববারের (১৪ নভেম্বর) স্থানীয় দুটো কাগজের নাম উল্লেখ করে যে কোনো একটা সংগ্রহে রাখতে বললাম। পরে কাগজটা হাতে পেলাম। ব্যক্তিগত একটা বিষয়ে ব্যস্ততা থাকায় বাড়ি এসে দেখবো বলে কাগজটা রেখে দিলাম। রাতে ১২টার দিকে বাড়ি ঢুকে প্রথমেই ‘নিউজটা’ দেখলাম। থানা বাজারের হোটেলে রাতে খেতেও যাওয়া হয়নি। আরেক ছোট ভাই বিরানির প্যাকেট এনে দিয়েছিল সেটা খেতে খেতে মনে হলো ‘খবরটা’ সম্পর্কে কিছু বলা দরকার।

আমি আসলে ‘নিজেদের’ (সাংবাদিক) মধ্যেকার অথবা সংবাদ সংশ্লিষ্ট অসঙ্গতির বিষয়ে নির্মোহভাবে কিছু বলার চেষ্টা করি। এ কারণে যাদের গায়ে লাগে তারা আমাকে পছন্দ করা তো দূরের কথা বরং আমার নামে বিষোদ্গার আর কুৎসা রটাতেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু তাতে আমার কিছু আসে যায় না। তবে বহু মানুষের ভালোবাসা আমার প্রতি রয়েছে এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। যাই হোক উল্লেখযোগ্য কোনো অসঙ্গতি দেখলেই তা নিয়ে সামাজিক যোগোযোগমাধ্যমে এবং গণমাধ্যমে একটু লিখে থাকি। কিছু পয়সা লেনদেনের মাধ্যমে নানা ইস্যুতেই নিউজের কাউন্টার নিউজ দেখা যায়। এগুলো প্রধানত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে এগুলোকে সিন্ডিকেট নিউজ বলা হয়। সঙ্গত কারণেই আজ এই কাউন্টার প্রসঙ্গটা আনতে হলো। অনেক ভুঁইফোঁড় মিডিয়ার ‘সাংবাদিক’ নীতিহীন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে দ্বিধাহীনভাবে কলঙ্কিত করছেন। এদের কারণেই কিন্তু অপসাংবাদিকতা ছেয়ে যাচ্ছে সবখানে। কাউন্টার নিউজও অপসাংবাদিকতার উল্লেখযোগ্য একটা অংশ।

রোববারের স্থানীয় কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশ হওয়া ওই ‘খবর’ নিয়ে প্রথমে নিজের ভেতরে এক রকম বিভ্রান্তি দেখা দিল। এতবড় ‘দুঃসাহসিক ঘটনা’ ঘটলো অথচ কিছুই টের পেলাম না। একজন ক্ষুদ্র সাংবাদিক হিসাবে নিজেই নিজেকে ‘ধিক্কার’ দিতে ইচ্ছা করছিল। একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় তিন কলামজুড়ে এবং আরো কয়েকটি দৈনিকের প্রথম ও শেষ পাতায় সিঙ্গেল কলামে ‘খবরটি’ প্রকাশিত হয়। সেটা যখন কাগজে পড়তে শুরু করেছি। ইন্ট্রো দেখেই আর বুঝতে বাকি থাকলো না। ‘দৌলতপুরে তুচ্ছ ঘটনায় যুবলীগ নেতা বাবু গ্রেপ্তার’ এই শিরোনামে আমার করা একটি নিউজকে কাউন্টার দিতেই ওই ‘নিউজটা’ সামনে আনা হয়েছে। ‘নিউজের’ পুরোটা মনোযোগ দিয়ে দেখলাম। এতে নিউজ মেকারের সুস্পষ্ট অপরিপক্কতা ফুটে উঠেছে। কাউন্টারের পরিবর্তে অনেকটা নিজেই নিজের বাঁশ নেয়ার মতো মনে হয়েছে। একটা নিউজকে কাউন্টার দিতে গেলে যেই দক্ষতার দরকার হয় তার বিন্দুমাত্র সেখানে পাওয়া গেল না। বরং বরাবরের মতো ওই নিউজ মেকারের আনাড়িপনাই পরিলক্ষিত হলো।

তিন কলামে বের হওয়া ‘নিউজটার’ হেডলাইনও ছিল অনেকটা সাংঘর্ষিক। যার হেডিং ছিল, ‘দৌলতপুরে ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীকে ধরতে গিয়ে জনতার রোষানলে পুলিশ’। আবার সাব হেডে ছিল, ‘আসামী ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা’। তারা ‘আসামি’ বানান ভুল করে ‘আসামী’ লিখলেও সেটা আলাদা বিষয়। তবে হেডলাইনে উল্লেখ করা ‘চেয়ারম্যান প্রার্থী’ আর ‘আসামি’ কিন্তু একই ব্যক্তি। এখানে একই ‘নিউজের’ হেডলাইনে একই ব্যক্তিকে দুইভাবে দেখানো হয়েছে। আর ‘ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী’ বলা হলেও তিনি আসলে প্রার্থী নন, প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তাহলে প্রার্থী হলেন কীভাবে? এই প্রশ্ন রেখে এবার সাব হেড ও বডির দিকে একটু তাকাই আরো কিছু প্রশ্নের উত্তরের প্রত্যাশায়। সাব হেডে তাকে ‘আসামী’ বলা হলেও তিনি আসলে কীসের আসামি ‘নিউজের’ বডিতে তাও ঠিকমতো স্পষ্ট করতে পারেননি ওই নিউজ মেকার। যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ নিউজ মেকিংয়ের বিষয়ে তার দক্ষতার অভাব বা অপরিপক্কতাই পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

ভুলভাল ওই ‘নিউজের’ ভেতরে যা উল্লেখ করা হয়েছে তার সারাংশ হচ্ছে, ‘কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী সালাহ উদ্দিন বাবুকে গ্রেপ্তারকালে তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে এলাকাবাসী। পরে অতিরিক্তি পুলিশ গিয়ে মামলার আসামি সালাহ উদ্দিন বাবুকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেয়। শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে দৌলতপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের দাড়পাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। গ্রেপ্তার হওয়া সালাহ উদ্দিন বাবু সংঘর্ষ ও হামলা মামলার আসামি।’ ‘বাবুকে গ্রেপ্তার করার খবর শুনে বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মহিউল ইসলাম মহির সমর্থকরা প্রতিপক্ষ সালাহ উদ্দিন বাবুর ওপর হামলা চালিয়ে তাকে মারধরের চেষ্টা করলে এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে আসামি বাবুকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেয়।’

ওই ‘নিউজটার’ ভেতরে রাত সাড়ে ৭টার দিকে বাবুকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে এটা ঠিক আছে। এ ছাড়া বাবুর নামের সঙ্গে ‘আসামি’ শব্দটা সাতবার উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সংঘর্ষ ও হামলা মামলার আসামি এটাও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রেপ্তারের সময়ে তাকে (নিউজের ভাষায় আসামি) সত্যিই কী ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তিনি আসলেই কী সংঘর্ষ ও হামলা মামলার আসামি ছিলেন?। আমার সূত্রের তথ্য মতে, সেখানে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। দুই পক্ষের মধ্যে সামান্য উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। আর দৌলতপুর থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে শুক্রবার গভীর রাতে। চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম মহি নিজে বাদী হয়ে এই মামলা করেছেন। তাহলে নিউজ মেকার আগ বাড়িয়ে রাত সাড়ে ৭টার দিকে তাকে গ্রেপ্তারের সময়েই সংঘর্ষ ও হামলা মামলার আসামি বলে চালিয়ে দিলেন কীভাবে?। সেক্ষেত্রে পুরো ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত বললে দোষ কোথায়?।

বাবুকে গ্রেপ্তারের খবর শুনে চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম মহির সমর্থকরা প্রতিপক্ষ সালাহ উদ্দিন বাবুর ওপর হামলা চালিয়ে তাকে মারধরের চেষ্টা করে বলেও ওই ‘নিউজের’ আরেক অংশে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তারের খবরে তো প্রতিপক্ষের লোকজনের আর উত্তেজিত হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে না, বরং তারা নিবৃত হয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে বাবুর ওপর হামলা চালিয়ে তাকে মারধরের চেষ্টা করা হলো কী করে?। তবে ‘নিউজের’ শেষ অংশে পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলামের বক্তব্যে বাবুকে একটি’ মামলার আসামি বলা হয়েছে। আমার কাছে শুধু সেটাই সঠিক ছিল বলে মনে হয়েছে। কারণ, তিনি কিন্তু ‘একটি মামলা’ বলেছেন নির্দিষ্ট করে বলেননি সেটা কীসের মামলা। এমনও হতে পারে, সেটা ছিল অপরের প্রেমঘটিত অপহরণ মামলা কিংবা অন্য কোনো পেন্ডিং মামলা। সুতরাং ওই ‘একটি মামলা’ শব্দ দুটোর ব্যবহার ছাড়া পুরো ‘নিউজটাই’ ছিল গোঁজামিলমার্কা। এতে নিউজ মেকারের অদূরদর্শীতারই প্রকাশ ঘটেছে।

এখানে বলা দরকার, যুবলীগ নেতা গাজি সালাহ উদ্দিন বাবুর গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিউজ করার জন্য এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাসির উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি একটি বারের জন্যেও পুলিশের কাছ থেকে বাবুকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টার কথা বলেননি। তাহলে ওই নিউজ মেকার এই স্পর্শকাতর তথ্য কোথায় পেলেন? এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে স্বাভাবিক। কোনো সাংবাদিক ব্যক্তি স্বার্থের জন্য ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের অংশীদার হবেন, এটা আসলে আমাদের কারোরই কাম্য নয়। ন্যূনতম হলেও মানবিক বিবেচনাবোধ ও দায়বদ্ধতার দরকার রয়েছে।

গ্রেপ্তার গাজি সালাহ উদ্দিন বাবু দৌলতপুর সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। তিনি ওই ইউনিয়ন থেকে গতবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) হয়ে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ইউনিয়নটিতে বাবুর নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। এবারেও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও পরে প্রত্যাহার করে নেন। সমর্থন দেন দলটির আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের জহুরুল ইসলামকে। গাজি সালাহ উদ্দিন বাবুর পরিবারের অভিযোগ, পুলিশকে প্রভাবিত করে বাবুকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাবুকে আটকে রাখা না গেলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম মহির নিশ্চিত ভরাডুবি হবে, এ কারণে তাকে ষড়যন্ত্রের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।

একইদিনে (১৪ নভেম্বর) স্থানীয় আরো কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় আসা ওই ‘নিউজটার’ মধ্যে ওপরের দিকে উল্লেখ করা শুধু তিন কলামে প্রকাশ হওয়া ‘নিউজের’ সাংঘর্ষিক হেডিং ছাড়া অন্যগুলোয় হেডিং ছিল, ‘দৌলতপুরে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনতাইয়ের চেষ্টা’। এখানে ‘আসামি ছিনতাই চেষ্টার অভিযোগ’ বললেও মিথ্যা হওয়া সত্ত্বেও কিছুটা মানিয়ে নেয়া যেত। ‘অভিযোগ’ শব্দের ব্যবহারেও অনেক সমালোচনা থেকে মুক্ত থাকা যায়। যাই হোক ওই একই হেডিংয়ের সঙ্গে অপরাপর পত্রিকাগুলোয় আসা পুরো ‘নিউজের’ বডিও ছিল হুবহু একই রকম। সেই পত্রিকাগুলোয় নিউজে’ কোথাও কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ এটা সিন্ডিকেট নিউজ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সিন্ডিকেট নিউজের ব্যাপারটা আমি ব্যক্তিগতভাবে সব সময় এড়িয়ে চলি এবং বারবার এর বিপক্ষেই কথা বলি। এ কারণে নিজে যে কয়টি মিডিয়ায় কাজ করি সেগুলোতেই কেবল আমার নিউজ যায়। সুতরাং সিন্ডিকেটের মতো আমার দখলে অত মিডিয়াও নাই। সিন্ডিকেটমুক্ত থেকে নিজে যেটুকু পারি সেটুকুই করি। শেষ করবো, এই লেখার শিরোনাম দিয়েই। সিন্ডিকেটকে কাউন্টার নিউজের ক্ষেত্র তৈরি করেছিলাম আমি নিজেই, একজন অনুজকে বিশ্বস্ত মনে করে একটি আগাম বার্তা দিয়ে। কিন্তু সেও বুঝিয়ে দিল বিশ্বাস টিশ্বাস বলে কিছু নাই। টাকাই আসলে সব।

লেখক : এস আর সেলিম, সাংবাদিক।