বিখ্যাত মনীষী মালেক ইবনে দিনার (রহঃ)

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক
বিজ্ঞাপন

মালেক ইবনে দিনার (রহ.) ইরাকের কূফা নগরীত জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য। দুনিয়া বিমুখতা, আল্লাহ ভীরুতা তাঁর অন্তরের জায়গা করে নিয়েছিল। আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগী করে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন। তিনি ২য় হিজরির বিখ্যাত সুফি ও ইসলাম বিশ্লেষক। মদখোর থেকে তিনি পৃথিবীর খ্যাতনামা ইমাম হয়েছিলেন। একটা স্বপ্ন তাঁর জীবনকে পাল্টে দিল।

একদিন লোক ভরপুর এক মাহফিলে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। শুরুতেই এক শ্রোতা প্রশ্ন করল, আপনার বক্তৃতা পড়ে শুনব। তার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর দিন। বছর দশেক আগে আপনাকে মাতাল, ছন্নছাড়া খারাপ কাজ ছাড়া ভালো কাজে দেখিনি কখনো। অথচ আজ আপনার এই পরিবর্তন? শ্রোতার এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, শুনুন সেদিন ছিল শবে কদরের রাত। শহরের মদের দোকানগুলো ছিল বন্ধ। এক দোকানিকে অনুরোধ করে মদ নিয়ে চলে এলাম বাসায়। রাতে মদ ছাড়া ঘুমই আসত না।

সেদিন বাসায় ঢুকেই দেখি স্ত্রী নামাজ পড়ছে। নিশ্চুপে আমার ঘরে চলে এলাম। টেবিলে রাখলাম বোতলটা। হঠাৎ আমার তিন বছরের মেয়েটা দৌড়ে এলো। টেবিলে সঙ্গে তার ধাক্কা লেগে মদের বোতলটি পড়ে ভেঙে গেল। সেটা দেখে অবুঝ মেয়েটি খিলখিল করে হাসতে লাগল। মেয়ে বলে তাকে কিছু বলতেও পারছিলাম না। ভাঙা বোতল ফেলে দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। সেরাতে আর মদ খাওয়া হল না। তারপর চলে গেছে এক বছর।

আবার এল লাইলাতুল কদর। অভ্যাস মতোই আমি মদ নিয়ে বাসায় এলাম। হঠাৎ বোতলের দিকে তাকাতেই বুক ভেঙে কান্না এলো। কারণ তিন মাস আগে আমার মেয়েটি ইন্তেকাল করেছে। গতবার তার বোতল ভাঙার কাহিনী আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মদটা আর খেতে পারলাম না। ঘুমিয়ে পড়লাম। মাঝ রাতে স্বপ্নে দেখলাম এক বিরাট সাপ আমাকে তাড়া করছে। ভয়ে আমি দৌড়াচ্ছি। এমন সময় এক দুর্বল বৃদ্ধকে দেখে অনুরোধ করলাম আমাকে রক্ষা করতে। কিন্তু বৃদ্ধ বলল, আমি খুব দুর্বল এবং ক্ষুধার্ত।

এ সাপের সাথে আমি পারব না। তুমি বরং এই পাহাড়ের ডানে যাও। বৃদ্ধের কথা মতো পাহাড়ে উঠেই দেখি দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আর পেছনেই এগিয়ে আসছে সেই মোটা কুৎসিত সাপ। আমি বৃদ্ধের কথা মতো ডানে ছুটলাম। দেখলাম সুন্দর বাগানে বাচ্চারা খেলছে। বাগানে ঢুকতে চাইলে দারোয়ান বাঁধা দিল। বাচ্চাদের ডেকে বললো, দেখতো এলোকটি কে? ওকে তো সাপটা খেয়ে ফেলবে, নয়তো আগুনে ফেলে দেবে। দারোয়ানের কথায় বাচ্চারা ছুটে এলো। এর মধ্যে তিন মাস আগে মৃত্যুবরণ করা আমার মেয়েটা’কে দেখলাম।

মেয়েটা আমাকে ডান হাতে জড়িয়ে বাম হাতে সাপটাকে থাপ্পর দিলো। ভয়ে সাপ পালিয়ে গেলো। বললাম, মা তুমি কত ছোট আর এত বড় সাপ তোমাকে ভয় পায়? মেয়ে বললো, আমি তো জান্নাতি মেয়ে। জাহান্নামের সাপ আমাদের ভয় পায়। বাবা ওই সাপকে তুমি চিনতে পেরেছো? বললাম, না মা সাপকে তো চিনতে পারিনি। বাবা ওতো তোমার নফস। তুমি নফসকে এতো বেশি খাবার দিয়েছো তার জন্য শক্তিশালী হয়েছে। বললাম, পথে এক দুর্বল বৃদ্ধ এখানে আসতে বলে দিয়েছে।

সে কে? মেয়ে বললো, সে তোমার রুহ। তাকে তো কোনোদিন খেতে দাওনি। তাই না খেয়ে দুর্বল হয়েগেছে। এরপর আমার ঘুম ভেঙে গেলো। সেইদিন থেকে আমি আমার রূহকে খাদ্য দিয়ে যাচ্ছি আর নফসের খাদ্য একদম বন্ধ করে দিয়েছি। এখনো চোখ বুঝলেই নফসের সেই ভয়াল রূপ দেখতে পাই। তারপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন মালেক বিন দিনার (রহঃ)। তিনি হয়ে গেলেন ইসলামের মহামনীষী। পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল তাঁর খ্যাতি।

মালিক বিন দিনার (রহ.)-এর বাড়িতে একদিন এক ভয়ংকর চোর এসেছে। চোর সে-সময়ে সবচেয়ে কুখ্যাত দুর্ধষ হিসেবে খ্যাত ছিলো। দীর্ঘসময় খোঁজাখুজি করেও ঘরে একটি কানা কড়িও পেলো না। এরপর সামনে তাকিয়ে দেখলো মালিক বিন দিনার (রহ.) জায়নামাজে নামাজ পড়ছেন। নামাজ পড়ে তিনি সালাম ফিরালেন। দেখলেন, ঘরে কিছু না পেয়ে চোর হাবার মতো দাঁড়িয়ে আছে। মালিক বিন দিনার (রহ.) চোরকে বললেন- আমার ঘরে কিছুই পেলে না। পাবেও না? ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার কিছুই যে আমি জমা করিনি।

আচ্ছা তোমার কাছে কি আখেরাতের পাথেয় আছে কিছু? চোর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছে- লোকটা বলে কী! মালিক বিন দিনার (রহ.)-এর কথা শুনে কুখ্যাত চোরের দু‘চোখ বেয়ে অশ্রু পড়তে লাগলো। তখন ফজরের সময় হয়ে গেলে দু‘জনেই একসঙ্গে মসজিদে নামাযে চললেন। মুসল্লিরা দেখে হতবাক! ভয়ংকর চোর বড় আলেমের সাথে! তাও মসজিদে নামাজ পড়তে! কীভাবে সম্ভব! মালিক বিন দিনার (রহ.) সবাইকে বললেন, সে আমাদের বাসায় চুরি করতে এসেছে। আমি তার দিল চুরি করে নিয়েছি। তাই তার পরিবর্তন এসেছে।

মালেক ইবনে দিনার (রহঃ) একবার বাজার দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখেন অসাধারণ সুন্দরী একজন দাসীকে বিক্রির জন্য আনা হয়েছে। তখনকার সময়ে বাজারে স্বাভাবিক দাস-দাসী বেচাকেনা হত। বিত্তশালী দাস দাসী ক্রয় করতো। তখনকার সময়ে দাস দাসীদের কারো কারো মূল্য ১ লক্ষ দিরহামও হত। মালিক ইবনে দিনার (রহ.) সেই দাসীর মালিকের সামনে গিয়ে সরাসরি দাসীকে বললেন, ”আমি তোমাকে কিনে নিতে চাই।” এ কথা শুনে সেখানে উপস্থিত সবাই ও দাসী হেসে ফেলল। এমনকি দাসীও বলল আপনার মত গরিব লোক আমাকে কি করে কিনবেন? মালিক ঠাট্টাচ্ছলে বলল, ”এ দাসীর মূল্য আপনি কত দিতে পারবেন? মালেক বিন দিনার (রহ.) বললেন, ”কত দাম দেব।

আমি খুব সস্তায় কিনতে চাই।” দাসীর মালিক বলল, ”বলুন কত দাম দেবেন?” মালেক বিন দিনার (রহ.) বললেন, ”আমার কাছে এ দাসীর মূল্য হচ্ছে খেজুরের চুষে খাওয়া দুটি দানা।” এই উত্তর শুনে দাসীর মালিক ও উপস্থিত সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। দাসীর মালিক বলল এটা কি কোনো দাম হল? মালেক ইবনে দিনার (রহ.) বললেন, যদি এই দাসী সুগন্ধি না মাখে তাহলে ঘামের গন্ধ তার শরীর দুর্গন্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিন যদি দাঁত পরিষ্কার না করে তাহলে কাছে বসা যায় না।

প্রতিদিন যদি মাথা না আঁচড়ায় তাহলে তার মাথায় উকুন অন্যের মাথায় যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কয়েক বছর পর সে বৃদ্ধ হবে। তখন সে একদম অকেজো হয়ে যাবে। এছাড়াও তার দুঃখ, কষ্ট, দুশ্চিন্তা, রয়েছে হিংসা, ঘৃণা, ক্রোধের মিশ্রণ। সে নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য তোমাকে মোহাব্বত করে। তার এই ভালোবাসা অকৃত্রিম সে ভালোবাসার অভিনয় করে। তারপর মালিক ইবনে দিনার (রহ.) বলল আমার কাছে এক দাসী আছে তাকে খরিদ করবে? দাসীর মালিক বলল কোথায় সে দাসী? তিনি বললেন, সে দাসী মাটির তৈরি নয় বরং মেশক, আম্বর, জাফরান এবং কাফুরের তৈরি। তার চেহারায় যে নূর রয়েছে সে আল্লাহর নূরের অংশ।

হাদিসে বলা হয়েছে তার চেহারা যদি দুনিয়ার অন্ধকারে দেখানো হয় তাহলে গোটা পৃথিবী আলোকিত হয়ে যাবে। তার চেহারার সামনে সূর্যের আলো ম্লান হয়ে যায়। সে যদি সমুদ্রে থুতু নিক্ষেপ করে তাহলে সমুদ্রের সব পানি মিঠা হয়ে যাবে। সে যদি নিজের আঁচলের দোলা দেয় তাহলে গোটা পৃথিবী সুবাসিত হয়ে যাবে। সে জাফরান এবং মেশকের বাগানে প্রতিপালিত হয়েছে। তাসনিম ঝরনার পানি পান করেছে। তার ভালবাসা খাঁটি। সে ভালোবাসায় কোনো কৃত্রিমতা নেই। সে একান্ত অনুগত এমকি আনুগত্যে কোনো ফাঁকি নেই।

তার মনে কোন হিংসা, অহংকার, ক্রোধ নেই। তার বয়স বাড়বে না, সে সব সময় থাকবে সুন্দরী এবং যুবতী । তার কখনো মৃত্যু হবে না। এবার বল আমার দাসী উত্তম নাকি তোমারে দাসী উত্তম। দাসীর মালিক বলল আপনি যে দাসীর কথা বলেছেন নিঃসন্দেহে সে অতি উত্তম। কিন্তু তার মূল্য কত? তিনি বললেন তার মূল্য বেশি নয়! তাকে পেতে হলে কেবল আল্লাহ’কে সন্তুষ্ট করতে হবে।

একথার পর দাসীর মালিকের অন্তরে পরিবর্তন আসলো। সে দাসীকে বলল শুনলে তো উনি কি বলেছেন? যাও তোমাকে আল্লাহর নামে আজাদ করে দিলাম? তুমি ছাড়া যত দাস-দাসী রয়েছে আমি সবাইকে আজাদ করে দিলাম। আমার সমুদয় ধন-সম্পদ গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করে দেব। দাসীর মালিক দামি দামি পোশাক দান করে ঘরের দরজা জানালার পর্দা দিয়ে নিজের জামা তৈরি করল। দারিদ্র্যতার জীবনকে বেছে নিলো। এই ধরনের ঘটনাবলী বুযুর্গানে দ্বীনের দ্বারা অনেক বেশী পরিমাণে ঘটিয়া থাকে।

জোশের সহিত কোন কথা তাহাদের জবান হইতে বাহির হইয়া যায়। আল্লাহ এই ভাবেই উহাকে পূরণ করিয়া দেন। দাসীর সেই মালিক আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কাজে বেরিয়ে পড়লেন। মালেক ইবনে দিনার (রহ.) দাসীর সাথে সেই মালিকের বিয়ে দিলেন। এরপর দুজন ইবাদাত বন্দেগী করার দ্বারা আল্লাহর ওলীতে পরিণত হল। আল্লাহ আমাদেরকেও দুনিয়ার মহব্বত দূর করে আখিরাতের মোহাব্বত ও ইবাদাত করার সক্ষমতা দান করুক। আমিন।

নভেম্বর ১১.২০২১ at ১৮:৫৫:০০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আক/মুশাইসা/রারি