যেমন ছিল আওয়ামী লীগ নেতা আফাজ আহমেদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

সদ্যপ্রয়াত সাবেক সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা আফাজ উদ্দিন আহমেদ।
বিজ্ঞাপন

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আওয়ামী লীগের নাম আসলেই যার নামটি সবার আগে আসে তিনিই হলেন আফাজ উদ্দিন আহমেদ। সবার কাছে আফাজ বিশ্বাস নামেই বেশি পরিচিত। তিনি সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে পরতে পরতে ন্যায়, নিষ্ঠা ও সততার ছাপ রেখে গেছেন। তিনি সব সময়েই প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বাইরে ছিলেন। ক্ষমতার প্রভাবে বিরোধীমত দমননীতি ছিল না তার রাজনৈতিক দর্শনে। প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি কখনোই। তার মধ্যে ছিল সহনশীল মনোভাব। নানা কারণেই গণমানুষের কাছে দেশের রাজনীতিবিদদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ নিন্দিত, হাতে গোনা কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদ নন্দিত। আর সেই নন্দিত রাজনীতিবিদদেরই একজন ছিলেন আফাজ উদ্দিন আহমেদ। একজন শান্তশিষ্ট ও নিরেট ভদ্র রাজনীতিবিদ হিসেবে সবার কাছে অধিক পরিচিত ছিলেন তিনি। অাফাজ উদ্দিনকে দূরে রেখে এখানকার আওয়ামী লীগকে কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেননি। তারপরেও আওয়ামী লীগের ভেতরেই ঘাপটি মেরে থাকা দলের কুচক্রিরা তাকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার অপতৎপরতা চালিয়েছেন অনেকবার। কিন্তু তারা সফল হতে পারেননি।

দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়ায় আফাজ উদ্দিনের বাড়িতে বছর দশেক আগে ২০১১ সালে দূর নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী বোমা হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় তিনি আহত হলেও অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। ঘটনাস্থলেই মারা যান তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা তারাগুনিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ দুই বোমা হামলাকারী স্থানীয় যুবলীগ কর্মী। তিনি চাইলেই তাকে হত্যার উদ্দেশে চালানো সেই বোমা হামলার মামলায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জড়িয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু জড়াননি। বোমা হামলা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্যই তিনি কোনো রকম ক্ষমতার প্রভাব খাটাননি। অর্থাৎ বিরোধীমত দমনের মোক্ষম একটি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেটির প্রয়োজনই মনে করেননি। অাফাজ উদ্দিনের রাজনীতি ছিল এমনই পরিচ্ছন্নতানির্ভর। বারবার দলের ভেতর কোন্দল সৃষ্টি করে তাকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্রও হয়েছে। তাতেও কোনো লাভ হয়নি। বরং বারবারই উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বভার চলে এসেছে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাা আফাজ উদ্দিনের হাতেই। তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ছিলেন। তিনি কেমন মানসিকতা নিয়ে রাজনীতি করে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তা ভালো করেই জানতেন এবং বুঝতেন।

দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অাফাজ উদ্দিন আহমেদের রয়েছে বর্ণাঢ্য ইতিহাস। এখানকার আওয়ামী লীগের সঙ্গে আফাজ উদ্দিনের নাম অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর একাধারে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে না ওঠায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানকার আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। সুদীর্ঘ এক রাজনৈতিক জীবনে তিনি নানা প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। অনেক চড়াই-উতরাই পার করতে হয়েছে তাকে। তবুও আপসকামী রাজনীতিতে জড়াননি। কখনো বড় করে দেখেননি নিজের ব্যক্তি স্বার্থকে। সব সময় প্রাধান্য দিয়েছেন জনস্বার্থকে। অত্যন্ত মিষ্টভাষী ও সদালাপী এই নেতা তার পরিচ্ছন্ন ইমেজের কারণেই নিজ দলের বাইরেও দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে ছিলেন একজন অতিশয় গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আফাজ উদ্দিন আহমেদ এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৯০ সালের দ্বিতীয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তখনকার উপজেলা বিএনপির সভাপতি আহসানুল হক মোল্লাকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান থাকায় ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল আলম দুদুকে দৌলতপুর আসনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। ওই নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামসুল আলম দুদুকে পরাজিত করে বিএনপির আহসানুল হক পচা মোল্লা প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে আফাজ উদ্দিন আহমেদ আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান। তবে পরপর দুইবারই তিনি বিএনপির প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী আহসানুল হক মোল্লার কাছে পরাজিত হন। পরে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হওয়া আহসানুল হক পচা মোল্লার আপন ভাইয়ের জামাই ছিলেন অাফাজ উদ্দিন আহমেদ। প্রতিবার জাতীয় নির্বাচন এলেই জামাই-শ্বশুরের ভোটের লড়াই জমে উঠতো। পরপর চারবার আহসানুল হক মোল্লা এমপি নির্বাচিত হয়ে আসলেও ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তার মৃত্যুর পর ২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনটি তাদের হাত ছাড়া হয়ে যায়। ওই নির্বাচনে তখনকার উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলতাফ হোসেনকে পরাজিত করে মহাজোটের মনোনীত প্রার্থী অাফাজ উদ্দিন আহমেদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর রাজনীতিতে নিজে সংবেদনশীল থাকলেও তাতে বাগড়া পড়ে মেজো ছেলে আরিফ আহমেদ বিশ্বাসের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। আফাজ উদ্দিন ক্ষমতাকে পুঁজি করে টাকা কামানোর চিন্তাও করেননি কখনো। কিন্তু আরিফ বিশ্বাসের কারণে দলের ভেতের-বাইরে সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাকে। অনেকেটা ঘরের শত্রু বিভীষণের মতো অবস্থা হওয়ায় পরবর্তী নির্বাচনের জন্য তা কাল হয়ে দাঁড়ায়।

সামনে আসে উপজেলা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী একটি গ্রুপ। এতে নেতৃত্ব দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রেজাউল হক চৌধুরী। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় নির্বাচনে আফাজ উদ্দিন আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেলেও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) রেজাউল হক চৌধুরীর কাছে পরাজিত হন। নিজ দল সরকারে থাকলেও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আফাজ উদ্দিন আহমেদকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে রাখা হয়। দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরেও ক্ষমতার বাইরে চলে যান তিনি। ক্ষমতাসীন দলের একজন সাবেক এমপি এবং দলীয় সভাপতি হিসেবেও তিনি নিজ থেকে সিটিং এমপি রেজাউল চৌধুরীর সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়ানোর পক্ষে ছিলেন না বলে দলটির নেতাকর্মীরা জানাচ্ছেন।

দলের অনেকে মনে করেন, ওই নির্বাচনে ছেলে আরিফ বিশ্বাসের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাশুল গুনতে হয় তাকে। দোষে-গুণেই মানুষ। আফাজ উদ্দিনও এর পুরোপুরি ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তবে সব মিলে তার গুণের পাল্লাই অনেক বেশি ভারি ছিল। শুধুমাত্র মেজো ছেলে উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ আরিফ আহমেদ বিশ্বাসের খামখেয়ালিপনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই আফাজ উদ্দিন আহমেদকে রাজনীতিতে একটুও সমালোচনার মুখে পড়তে হতো না, হতেন শতভাগ সফল রাজনীতিক। তার মানে এই নয় যে, তিনি ছেলেকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। বরং ছেলে অারিফ বিশ্বাসই অনেকটা অবাধ্য হয়ে নিজের দুর্নামের ভাগ বাবার ঘাড়ে তুলে দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য আরিফ বিশ্বাসকেও নিয়ন্ত্রণ করে তাকে পুরোপুরি রাজনীতির মাঠ থেকে বাইরে রাখেন অাফাজ উদ্দিন। সামনে আনেন ছোট ছেলে অ্যাডভোকেট এজাজ আহমেদ মামুনকে। বাবার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে অারিফ বিশ্বাস এলাকা ছেড়ে রাজধানীতে পাড়ি জমান। তিনি এখন রাজনীতির ধারে-কাছেও নেই। সবশেষ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের আলোচিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন আফাজ উদ্দিন আহমেদ। ওই নির্বাচনে নতুন মুখ আ. কা. ম সরওয়ার জাহান বাদশাহ্ দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

তবে আফাজ উদ্দিন আহমেদকে একাদশে মনোনয়ন দেয়া না হলেও সবশেষ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তার ছোট ছেলে অ্যাডভোকেট এজাজ আহমেদ মামুনকে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। সাবেক সংসদ সদস্য রেজাউল চৌধুরীর ছোট ভাই উপজেলা যুবলীগের বর্তমান সভাপতি বুলবুল আহমেদ টোকেন চৌধুরীও তার বড় ভাইয়ের মতো ওই নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হন। কিন্তু অাফাজপুত্র আরিফ বিশ্বাসের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় টোকেন চৌধুরী নির্বাচনে সুবিধা করতে পারেননি। তাকে পরাজিত করে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এজাজ আহমেদ মামুন। অন্যদিকে সবশেষ সম্মেলনে পুনরায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বরাবরের মতোই সুনামের সাথে দলটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন বর্ষীয়ান নেতা আফাজ উদ্দিন আহমেদ। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এ পর্যায়ে এসে মহামারি করোনায় মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে স্ত্রীসহ না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন জনপ্রিয় প্রবীণ রাজনীতিক আফাজ উদ্দিন আহমেদ। তার এই মৃত্যুতে দৌলতপুর উপজেলাবাসী নিমজ্জিত গভীর শোকে। জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া।