কোটচাঁদপুরে সাবেক এমপি নবী নেওয়াজের বিরুদ্ধে চাকুরীর নামে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

ঝিনাইদহ-৩ আসনের সাবেক এমপি নবী নেওয়াজের বিরুদ্ধে অগণিত মানুষের কাছ থেকে চাকুরী দেয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এদিকে টাকা ফেরতের দাবীতে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হয়েছে। রবিবার বেলা ১১টার দিকে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের আয়োজনে কোটচাঁদপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক ভুক্তভোগী পরিবার অংশ নেয়।

মানববন্ধনে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ২০১৪ সালে নবী নেওয়াজ ঝিনাইদহ-৩ আসনে (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আওয়ামীলীগের মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। সে সময় তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরীর চাকুরির প্রলোভন দেখান এমপি নবী নেওয়াজ। এ প্রলোভনে অধিকাংশ ভুক্তভোগী চুক্তি অনুযায়ী নিজের যত সামান্য জমি-জমা বিক্রি বা বন্দক দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা সাবেক এমপি নবী নেওয়াজের কাছে দিয়েছেন। অনেকে এনজিও থেকে লোন নিয়ে চাকুরীর আশায় এমপি নবী নেওয়াজ ও তার কথামত এমপি’র স্বজনদের হাতে নগদ টাকা তুলে দেন। কিন্তু দীর্ঘ দিনেও সে চাকুরী হয়নি বা টাকাও কেউ ফেরত পাননি ।

বর্তমানে সম্পদ হারিয়ে এই সকল গরীব অসহায় পরিবার গুলি করোনা কালিন পরিস্থিতিতে চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ভুক্তভোগীরা বলেন- দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সাবেক এমপি নবী নেওয়াজ বিষয়টি সমাধান করবেন বলে একের পর এক আমাদেরকে ঘুরিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে আমাদের ধৈয্যের বাধ ভেঙ্গে গেছে। যে কারণে টাকা ফেরতের দাবীতে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কাছে আবেদন করাসহ আমরা পথে নামতে বাধ্য হয়েছি।

ভুক্তভোগী কোটচাঁদপুর পৌর আর্দশ পাড়ার বাসিন্দা বোরহান উদ্দীন বলেন, নবী নেওয়াজ এমপি হওয়ার পর উপজেলার সাফদারপুর এস.ডি ডিগ্রী কলেজে আমার বোনের চাকুরীর জন্য পারিবারিক সম্পর্ক থাকা সাফদারপুর ইউনিয়নের কন্যানগর গ্রামের নুর আলীর মাধ্যমে মহেশপুরে এমপি’র নিজ বাড়িতে ৪ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে আসি। পরে এসডি কলেজে চাকুরী না হওয়ায় হতাশায় পড়ে যায়। পরবর্তিতে তিনি পৌর মহিলা কলেজে চাকুরী দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু সেখানেও তিনি চাকুরী দিতে পারেন নি। বোনের চাকুরীর জন্য নিজেদের জমি-জমা বিক্রির টাকা এমপি নবী নেওয়াজকে দিয়েছি।

চাকুরী না হওয়ায় জমির সাথে টাকাও চলে গেছে। পরে এবিষয়ে এমপির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাকা নেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, নুর আলীর সাথে যোগাযোগ করতে। কয়েক বছর পূর্বে নুর আলী একটি ভূয়া চেক ও একটি ষ্টাম্প করে দেন। তারপরও এতোদিনেও এমপি নবী নেওয়াজ কিংবা নুর আলী এবিষয়ে ভ্রুক্ষেপ করছে না। বর্তমানে আমি আইনের আশ্রয় নিয়েছি। ভুক্তভোগী কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের ধোপাবিলা গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ৮৪ বছর বয়স্ক শুকুর আলী মাষ্টারের ছেলে আহসানুল হক সাবু বলেন- ২০১৫ সালের দিকে আমাকে নৈশ প্রহরীর চাকুরীর দেয়ার কথা বলে সাবেক এমপি নবী নেওয়াজের আত্মীয় মহেশপুর উপজেলার আলামপুর গ্রামের মান্নানের মাধ্যমে ৬ লাখ ২০হাজার টাকা নেন সাবেক এমপি নবী নেওয়াজ।

তিনি দাবী করেন টাকা গুলি মান্নানের সাথে যেয়ে ঢাকা ন্যাম ভবনে এমপি’র হাতে দিই। এমপি সাহেব টাকা গুলি তার স্ত্রী হাতে দিয়ে আলমারীতে তুলে রাখতে বলেন। আমার সে চাকুরী তো হয়নি বরং টাকা চাওয়াতে এমপি নবী নেওয়াজ আত্মীয় মান্নান ও তার বাহিনী দিয়ে টাকা দেয়ার নাম করে ডেকে তাদের দিয়ে আমার ও আমার শ্বশুরকে মারধোর পর্যন্ত করেছে । এমনকি পুলিশ দিয়ে একাধীক বার সে সময় হয়রানীও করেছে। কথা বলতে বলতে এসময় কেঁদে ফেলেন ভূক্তভোগী সাবু।

আরেক ভুক্তভোগী কোটচাঁদপুর উপজেলার ফাজিলপুর গ্রামের আমিরুল ইসলাম সরদার বলেন- বাবা-মা মরা আমার এতিম ভাইপো রুহুল আমিনকে খুব ছোটবেলা থেকে আমি বড় করেছি।

নৈশ প্রহরীর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে এলাকার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভাইপো রুহুল আমিনের চাকুরীর জন্য সে সময়ের এমপি নবী নেওয়াজের সাথে যোগাযোগ করি। এমপি নবী নেওয়াজ চাকুরীর আশ্বাস দিয়ে দরখস্ত করতে বলেন। এ সময় ওখানে (এমপি নবী নেওয়াজের মহেশপুর গ্রামের বাড়ী) উপস্থিত প্রতিবেশী ভাগ্নে আতিয়ার রহমানের কাছে টাকা লেনদেনের পরামর্শ দেন এমপি নবী নেওয়াজ। পরে তিনি চুক্তি অনুযায়ী ৭লাখ টাকা হলে চাকুরী হবে বলে আশ্বাস দেন। পরে ভাগ্নের ১বিঘা ও তার ১০কাঠা জমি বিক্রি করে এবং এনজিও থেকে লোন নিয়ে ৫লাখ ৮৬ হাজার টাকা যোগাড় করে কোটচাঁদপুর কলেজষ্টা-ের সিরাজুল ইসলামের বাসায় বসে আতিয়ার রহমানের হাতে তুলে দেন। এ সময় এলাকার বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু নিয়োগ স্থগিত হয়ে যায়। পরে টাকা ফেরত দিতে টালবাহানা করে দিনের পর দিন ঘোরাতে থাকেন এমপি নবী নেওয়াজ।

এক পর্যায়ে তিনি এমপি থেকে বিদায় নিলে নবী নেওয়াজের নিজ গ্রাম মহেশপুর কাদবিলা গ্রামে এক শালিসী বৈঠকে বাধ্য হয়ে এমপি নবী নেওয়াজের ভাগ্নে আতিয়ার ৫লাখ ৮৫ হাজার টাকার বেসিক ব্যাংকের একটি চেক দেন। চেক নং- ০২০৯২০১৯ । কিন্তু তারিখ অনুযায়ী চেকটি ব্যাংকে জমা দিলেও একাউন্টে টাকা না থাকায় চেকটি পাশ হয়নি। পরে আবারো শালিসে স্টাম্পের মাধ্যমে ২লাখ টাকা নগদ ফেরত দেন তারা। এর পর থেকে বাকি টাকা নিয়ে টালবাহানা করছেন। বর্তমানে আমার ভাইপো জমি হারিয়ে পরের জমিতে কামলা দিচ্ছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন- পরে জানতে পেরেছি একটি পদে একাধিক আওয়ামীলীগ পরিবারের সদস্যদের নিকট থেকে এভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাবেক এমপি নবী নেওয়াজ ও তার স্বজনেরা । তিনি বলেন, অনেকটা বাধ্য হয়েই শেষ পর্যন্ত সাবেক এমপি নবী নেওয়াজের বিরুদ্ধে প্রধান মন্ত্রীর নিকট অভিযোগ করেছি সেই সাথে মানববন্ধন করতে আমরা বাধ্য হয়েছি।

এদিকে অভিযুক্ত আতিয়ার নিজেই এ প্রতিবেদকের কাছে মোবাইল ফোনে বলেন- টাকা সাবেক এমপি নবী নেওয়াজ নেননি। টাকা তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে টাকা ফেরত দিয়েছেন তিনি। তিনি দাবী করেন এমপি সাহেব নিজে যে টাকা গুলি নিয়েছিলেন প্রত্যেকেরই চাকুরী দিয়েছেন।

বিষয়টি জানতে চাইলে বর্তমান এমপি অ্যাড. শফিকুল আজম খান চঞ্চল বলেন- এ ধরণের একাধিক অভিযোগ আমার কাছে এসেছে। তবে তিনি সাবেক এমপি তার বিরুদ্ধে আমিতো ব্যবস্থা নিতে পারিনা। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতারা দেখবেন। তিনি বলেন, যদি সাবেক এমপি এধরণে ঘটনা ঘটিয়েই থাকেন তার দায়িত্ব আওয়ামীলীগ নেবে না।

কোটচাঁদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাজাহান আলী বলেন- নবী নেওয়াজ এমপি থাকা অবস্থায় চাকুরীর দেবার কথা বলে গণহারে টাকা নেয়া সহ তার অন্যান্য অপকর্মের কথা জেলা মিটিং-এ তুলে ধরে ছিলাম। সেখানে জেলা নেতৃবৃন্দ ছাড়াও অনেক কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

মহেশপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সেক্রেটার ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ময়জদ্দিন হামিদ অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন- গরীব অসহায় পরিবারদের সাথে এমন আচারণ মেনে নেয়া যায় না। এর একটা সূরাহ হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে সাবেক এমপি নবী নেওয়াজের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন- আমি এমন কোন কাজ করেনি যে, কারনে আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন হবে। আমি এমপি থাকা অবস্থায় এলাকার উন্নয়নের কাজ করেছি। টাকার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমাকে রাজনৈতিক ভাবে হেয় করার জন্য প্রতিপক্ষ একটি মহল এগুলি করছে। তাদের উপর গজব নাযিল হবে, যারা আমার বিরুদ্ধে এগুলি করছে।