পীরের দরবারে খাদেম হত্যা, ৬ ভক্ত গ্রেপ্তার

কল্যাণপুরি পীরের দরবার শরীফের প্রধান গেট।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক পীরের দরবারে রাশেদ অালী (৩০) নামে এক খাদেমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মোবাইল চুরির অভিযোগে পীরের ভক্তরা দরবার শরীফের ভেতরে তাকে পিটিয়ে হত্যা করেন। রোববার (৬ জুন) দুপুরে উপজেলার কল্যাণপুরে ‘দরবার-এ রেসালাতে মোজাদ্দেদীয়া’ নামক একটি দরবার শরীফে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় পীর তাছের উদ্দিনসহ ৩০ জনের নামে দৌলতপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলার আসামি পীরের ৬ ভক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাশেদ গত চার মাস ধরে কল্যাণপুর দরবার শরীফেই থাকতেন। তিনি ওই দরবার শরীফের খাদেম ছিলেন। মোবাইল চুরির অভিযোগ এনে দরবারের লোকজন রোববার দুপুরে রাশেদকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে দরবার শরীফের ভেতরে ফেলে রাখেন। পরে রাশেদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলে তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার ঠিক মাঝপথে ভেড়ামারা বারমাইলে তিনি মারা যান। এ সময় নিহত রাশেদকে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে পালিয়ে যান পীর ভক্তরা।

নিহত রাশেদ আলী দৌলতপুর উপজেলার রিফায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে। এদিকে অনেকগুলো অাধুনিকমাণের সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকা কড়া নিরাপত্তা বেস্টিত ওই দরবার প্রাঙ্গণে গত কয়েকদিনের ফুটেজ আকস্মিকভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দরবার শরীফের ভেতরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

নিহত রাশেদের বাবা সাবেক মেম্বার আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে সোমবার (৭ জুন) দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় দরবার শরীফের পীর তাছের উদ্দিনসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো প্রায় ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে এ মামলার আসামি কল্যাণপুরি পীরের ৬ ভক্তকে গ্রেপ্তার করেছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- পার্শ্ববতী ভেড়ামারা উপজেলার কাচারিপাড়ার মোসাব্বির হোসেনের ছেলে সাইদুর রহমান মিলন (৩৫), দৌলতপুর উপজেলার কল্যাণপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে সামসুদ্দিন ওরফে শিমুল (২৮), সেনাইকুণ্ডি গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে আব্দুস সাদী শিমুল (৩৫), ইনছাফনগর গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে সুমন হোসেন (৩৫), হোসেনাবাদ গ্রামের জহুরুল ইসলামের ছেলে ইমরান আলী (২০) ও কল্যাণপুর গ্রামের আফিরুল ইসলামের ছেলে শফিউল রহমান লিমন (১৯)। তারা সার্বক্ষণিক দরবার শরীফের ভেতরে অবস্থান করতেন।

 

কল্যাণপুরি পীরের দরবার শরীফের ভেতরের একাংশ।

নিহতের বাবা আব্দুর রাজ্জাক জানান, তার ছেলে রাশেদকে মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ঘটনাকে হালকা করতে মোবাইল চুরির বিষয়টি এখন সামনে আনা হয়েছে। আসলে রাশেদ হয়তো পীরের গোপন বিষয়াদী দেখে ফেলেছিল, তাই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ ব্যাপারে জাকের ভাই নামে পরিচিত ‘দরবার-এ রেসালাতে মোজাদ্দেদীয়া’ দরবার শরীফের পীর তাছের উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। পুলিশ বলছে, বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।

দৌলতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাসির উদ্দিন জানান, হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এজাহার নামীয় ৬ আসামিকে ওই দরবার শরীফ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে ইতোমধ্যে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাছের পীরসহ মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, দৌলতপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় এই দরবার শরীফে বছরে তিনবার বিশাল মাহফিলের আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত বাস নিয়ে বিপুল সংখ্যক ভক্ত-অনুসারী এখানে সমবেত হন। এখানে যাতায়াত রয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও। ফলে করোনাকালেও তাদের মাহফিল বন্ধ রাখতে পারেনি প্রশাসন। বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই দরবার শরীফকে ঘিরে এলাকার মানুষের মাঝে কৌতূহলের শেষ নেই।