দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়নে বিপুল টাকা আদায়

দৌলতপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়নে অস্বাভাবিক হারে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। একেকটি লাইসেন্স নবায়নে সরকারিভাবে ২৫০ টাকা (ভ্যাট বাদে) করে খরচ হওয়ার নিয়ম থাকলেও সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এর অতিরিক্ত ৩ হাজার টাকা করে অাদায় করা হয়েছে। এসব টাকা সাব-রেজিস্ট্রারসহ অফিসটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন। নিজেরা অসংলগ্ন কথাবার্তার মাধ্যমে মোটা অঙ্কের এই বাড়তি টাকা গ্রহণের বিষয়টি কার্যত কবুল করে নিয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার অফিস কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দৌলতপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের লাইসেন্সধারী দলিল লেখক রয়েছেন ১৪০ জন। তাদের মধ্যে ২০২১ সালের লাইসেন্স নবায়ন করেছেন ১৩৬ জন। বাকি চারজন মারা গেছেন বলে জানানো হয়েছে। একেকটি লাইসেন্স নবায়নের সরকারি খরচ ২৫০ টাকা। ভ্যাট ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা। সব মিলে ব্যাংক চালানের মাধ্যমে ২৮৭ টাকা ৫০ পয়সা খরচ হওয়ার নিয়ম থাকলেও প্রতিটি লাইসেন্সের বিপরীতে দলিল লেখকদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে আদায় করা হয়েছে অতিরিক্ত আরো ৩ হাজার টাকা করে।

দৌলতপুর উপজেলা দলিল লেখক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরজ উল্লাহ জানান, তাদের প্রত্যেকের (১৩৬ জন) কাছ থেকে নতুন বছরের লাইসেন্স নবায়নের জন্য উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস কর্তৃপক্ষ বাড়তি ৩ হাজার টাকা করে আদায় করেছেন। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স প্রতি ৩০০ টাকারও কম খরচ হওয়ার কথা। সাব-রেজিস্ট্রারের বেঁধে দেয়া এই টাকার এক টাকাও কম নেয়া হয়নি। এসব টাকার বড় একটি অংশ গেছে উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রারের পকেটে। বাকি টাকা অফিসটির অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার বিলকিস আক্তার গত ২৯ ডিসেম্বর এই লাইসেন্স নবায়নের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই এখান থেকে বদলি হয়ে যান। ওইদিনই তাকে এ অফিস থেকে অানুষ্ঠানিক বিদায় জানানো হয়। এটিই ছিল সাব-রেজিস্ট্রারের এখানকার শেষ মিশন। অথচ বিলকিস আক্তার দাবি করেন, এসব লাইসেন্স নবায়নের আগেই তিনি বদলি হয়ে গেছেন। তিনি দায় চাপানোর চেষ্টা করেন মাত্র একদিন আগে (১১ জানুয়ারি) দৌলতপুর উপজেলায় দায়িত্ব নেয়া নতুন সাব-রেজিস্ট্রার স্বপ্না বিশ্বাসের ওপর।

উপজেলা দলিল লেখক সমিতির আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন বলেন, সমিতির আহ্বায়ক হয়েও আমাকে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ৩ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হতে হয়েছে। এই টাকা দলিল লেখকরা তাদের নিজ দায়িত্বে অফিসে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রধান অফিস সহকারী মুন্নিয়ারা খাতুন এসব টাকা গ্রহণ করেছেন।নিজ হাতে টাকা গ্রহণের জন্য সাব-রেজিস্ট্রার (সদ্য সাবেক) বিলকিস আক্তার মুন্নিয়ারা খাতুনের ওপর দায়িত্ব দেন। এর বাইরে দলিল লেখকরা সোনালী ব্যাংক, দৌলতপুর শাখায় নিজ নিজ লাইসেন্স নবায়নের জন্য ব্যাংক চালানের ২৮৭ টাকা ৫০ পয়সা জমা দিয়েছেন।

উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার বিলকিস আক্তার ইতোমধ্যে জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলায় বদলি হয়ে যাওয়ায় এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য মঙ্গলবার (১২ জানুয়ারি) মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিচয় দিয়ে দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়ন প্রসঙ্গে জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত আছেন উল্লেখ করে বিলকিস আক্তার বলেন, আমার হাতে এখন অনেক কাজ। কথা বলার সময় নেই। এ নিয়ে তার স্থলাভিষিক্ত নতুন দায়িত্ব গ্রহণকারী সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলার জন্য জানিয়ে নিজের দায় এড়িয়ে যান তিনি। কিন্তু নতুন সাব-রেজিস্ট্রার তো মাত্র একদিন আগে এখানে যোগ দিলেন, তিনি কীভাবে এ প্রসঙ্গে জবাব দেবেন বলতেই মোবাইলের সংযোগ কেটে দেন এখানকার সদ্য সাবেক এই সাব-রেজিস্ট্রার।

অফিসটির প্রধান সহকারী মুন্নিয়ারা খাতুনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে লাইসেন্স নবায়নে দলিল লেখকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনিও বদলি হয়ে যাওয়া সাব-রেজিস্ট্রারের ভঙ্গিতে বলেন, ভাই এখন খুব ব্যস্ত আছি। দুই মিনিট পরে কল দেন বিস্তারিত কথা বলছি। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের কিছুক্ষণের মধ্যেই পরপর তিনবার তার মোবাইলে কল করা হলেও ফোন রিসিভ করেননি তিনি। এর মিনিট দশেক পর আবারো দুইবার কল দেয়া হলে তবুও তিনি রিসিভ করেননি। বক্তব্য গ্রহণের প্রয়োজনে দফায় দফায় কল করেও প্রধান অফিস সহকারী মুন্নিয়ারা খাতুনের সাড়া পাওয়া যায়নি।

উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস কর্তৃপক্ষ দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়নের সুযোগে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় দলিল লেখকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অফিস কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেয়ায় দলিল লেখকরা অফিসের এই অবৈধ দাবি মেটাতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এদিকে সদ্য সাবেক উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার বিলকিস আক্তার নবাগত সাব-রেজিস্ট্রার স্বপ্না বিশ্বাসের ওপর অযৌক্তিকভাবে নিজের দায় চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করায় এবং প্রধান অফিস সহকারী কথা বলতে চেয়েও সাড়া না দেয়ায় তাদের অসঙ্গতির চিত্রই ফুটে উঠেছে। অহেতুক ব্যস্ততা দেখিয়ে অযৌক্তিক ও অসংলগ্ন কথাবার্তা বলার মাধ্যমে কার্যত তারা এই দুর্নীতির ঘটনাকে কবুল করে নিয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেছেন দলিল লেখকরা।