যেভাবে চলছে একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবন যুদ্ধ

সম্মানি ভাতা বঞ্চিত বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন্দ প্রামাণিক।

শুরু হয়েছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। একাত্তরে পাক-হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এ মাসেই লাল সবুজের এই দেশ স্বাধীন করে চূড়ান্ত বিজয় এনে দিয়েছেন তাদেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন্দ প্রামাণিক। বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের বাহিরমাদী গ্রামে। সত্তরোর্ধ্ব এই হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধার জীবন যুদ্ধ চলছে এখনো দিনমজুরি করে। দেশ স্বাধীনের ৫০ বছরেও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি ভাতা জোটেনি তার ভাগ্যে। জীবন সায়াহ্নে এসে এই বয়সেও তিনি কঠোর পরিশ্রম করে কোনো মতে সংসার চালাচ্ছেন।

জানা যায়, একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন্দ প্রামাণিক দেশ স্বাধীন হওয়ার বছরখানিক পরে নিজ গ্রাম দৌলতপুর উপজেলার বাহিরমাদী ছেড়ে চলে যান পার্শ্ববর্তী পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর গ্রামে। সেখানেই সংসার পেতে জীবন যাপন শুরু করেন। তিনি এক ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। চাঁন্দ প্রামাণিকের পিতার নাম বীশু প্রামাণিক। তার মুক্তিযোদ্ধা আইডি নম্বর এফ-৬৬ (ভারতীয়)।

২০১৭ সাল থেকে সারাদেশে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই শুরু হলে খোঁজ শুরু হয় ভারতীয় তালিকাভুক্ত দৌলতপুরের মুক্তিযোদ্ধা এফ-৬৬ আইডি নম্বরধারী ব্যক্তির। আর সেখান থেকেই উঠে আসে চাঁন্দ প্রামাণিকের নাম। কিন্তু নাম পাওয়া গেলেও বাধ সাধে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করার যুদ্ধ। গত তিন বছর ধরে বারবার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়নপত্র ও জন্ম নিবন্ধন কার্ড জমা দিয়েও নতুন করে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণ করার যুদ্ধে হেরে যান মহান মুক্তিযুদ্ধের এই বীর যোদ্ধা।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি স্বরূপ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ভারতীয় তালিকার ৮ নম্বর সেক্টরে কুষ্টিয়ার যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে তার নাম ৫১২ নম্বর ক্রমিকে লিপিবদ্ধ করা রয়েছে। তবে ওই তালিকা প্রকাশ হওয়ার পরেও আজ পর্যন্ত সম্মানি ভাতা পাননি মুক্তিযোদ্ধা চাঁন্দ প্রামাণিক। এ অবস্থায় জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে দিনমজুরির ওপর ভরসা করে বহু কষ্টে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা চাঁন্দ প্রামাণিক।

সাংবাদিকদের সামনে আবেগাপ্লুত হয়ে চাঁন্দ প্রামাণিক বলেন, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে গিয়েছিলাম। দেশের জন্য নিজের জীবনের কোনো তোয়াক্কা করিনি। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমার ভাগ্যে মেলেনি রাষ্ট্রীয়ভাবে দেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি ভাতা। তিনি জানান, সম্মানি ভাতা চালু করার জন্য উপজেলা সমাজসেবা অফিসে ৩-৪ বার মুক্তিযোদ্ধার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করার পরেও তার ভাতা চালুর ব্যবস্থা করা হয়নি। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেন বলেন, হয়তো তার নাম ঠিকানার বানানে কোনো সমস্যা আছে। সে কারণে বারবার আবেদন করা হলেও আবেদনটি মঞ্জুর করা হচ্ছে না। কিন্তু নাম ঠিকানার বানানে কোনো সমস্যা না থাকার পরেও সম্মানি ভাতার আওতায় না আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শুধু আবেদন গ্রহণ করি এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই। এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী বলেন, যে তিন ক্যাটাগরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানি ভাতা দেয়া হয় এর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রথম ক্যাটাগরিতেই চাঁন্দ প্রামাণিকের ভাতা পাওয়ার কথা। কিন্তু কী কারণে তিনি এই ভাতা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন তা বুঝতে পারছি না। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তাকে অবশ্যই সম্মানি ভাতার আওতায় আনা উচিত বলে মনে করছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী।

পদাধিকার বলে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের দায়িত্বে থাকা দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, কোনো সমস্যার কারণে হয়তো তার সম্মানি ভাতার আবেদন মঞ্জুর হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হবে। কোথাও জটিলতা থেকে থাকলে তা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

এলাকাবাসী বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারে এসে দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সম্মানিত করেছেন। সন্তোষজনকহারে বৃদ্ধি করেছেন তাদের সম্মানি ভাতার পরিমাণ। কিন্তু দেশের অপরাপর মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানি ভাতার সুযোগ পেলেও শেখ হাসিনার সরকার আমলে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও চাঁন্দ প্রামাণিকের ভাতা বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে শুধুমাত্র দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন আজও কেন তাকে এমন দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে থাকতে হবে। তিনি যেন জীবনের এই শেষ দিকে এসে অন্তত একটু শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারেন সেই জন্য তাকে সম্মানি ভাতা প্রদানের জোর দাবি করেন এলাকাবাসী।