চরাঞ্চলে জ্বলবে বিদ্যুতের আলো, সক্রিয় সিন্ডিকেট

চরাঞ্চলের দুই ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রস্তুত সাব-স্টেশন।

এতদিন সৌর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে থাকলেও এবার পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে স্থায়ীভাবে আলোকিত হতে যাচ্ছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের দুই ইউনিয়ন রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারীর বিচ্ছিন্ন বেশ কয়েকটি গ্রাম। চলতি বছরেই আলো জ্বলবে এ অঞ্চলে। এখন চলছে কাজের ধুমধাম। তবে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সমিতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার মিশনে ব্যস্ত হয়ে পড়া শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা পুরো চরাঞ্চলজুড়ে সক্রিয় রয়েছেন। তাদের খপ্পর থেকে মুক্তি মিলছে না বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে আগ্রহী মানুষজনের। ইতোমধ্যে বহু মানুষ তাদের অবৈধ দাবি পূরণ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নিয়ম অনুসারে ওই অঞ্চলের বসতিদের অধিকাংশের জামানত হওয়ার কথা সাড়ে ৪শ টাকা। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, সংযোগ ওয়্যারিং করতে ইলেক্ট্রিশিয়ানের বিল হওয়ার কথা ৫শ থেকে ৭শ টাকা। আর বাজারদর অনুসারে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দাম আসে ৯শ থেকে ১২শ টাকার মধ্যে। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের হিসেবে একেকটি বাড়িতে সংযোগ নিতে সব মিলে খরচ পড়ার কথা ২ হাজার থেকে ২২শ টাকা। অথচ নেয়া হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট সদস্যরা বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সকল কাগজপত্র গ্রাহক পর্যায় থেকে কৌশলে তুলে নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন মিটার প্রতি অতিরিক্ত দুই থেকে তিন হাজার টাকা। ভারতীয় সীমান্তবর্তী বিচ্ছন্নপ্রায় ওই অঞ্চলের অধিকাংশ বিদ্যুৎ প্রত্যাশীরই সুযোগ হয়নি বিদ্যুৎ অফিসের সাথে সরাসরি যোগাযোগের। তবে ইতোমধ্যেই তাদের ঘরে ঘরে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে সংযোগ স্থাপনের জন্য বিদ্যুতের ওয়্যারিং।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, খুঁটি পোঁতা থেকে শুরু করে ওয়্যারিং পর্যন্ত নানা কৌশলে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিতে চরাঞ্চলে মরিয়া হয়ে কাজ করছে কয়েকটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট। তারা খেটে খাওয়া সহজ সরল মানুষদের ভুলভাল বুঝিয়ে অবৈধভাবে বাগিয়ে নিচ্ছেন দ্বিগুণ, তিনগুণ বাড়তি টাকা। অনেকেই আবার সেজে বসেছেন বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি।

উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নে ওয়্যারিং পর্যন্ত কাজ পৌঁছালেও চরাঞ্চলের আরেক ইউনিয়ন চিলমারিতে প্রবেশ করছে বিদ্যুতের খুঁটি আর তার। পুরোপুরি কাজের ছোঁয়া সব এলাকায় না পৌঁছালেও এরইমধ্যে ওই ইউনিয়নেরও বাড়ি বাড়ি পৌঁছে গেছেন দালাল সিন্ডিকেটের সদস্যরা। কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়িয়ে ভোগান্তি ছাড়া সংযোগ পেতে চাইছেন স্থানীয়রা।

চরাঞ্চলকে আলোকিত করতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের খুঁটি ও তার স্থাপন।

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভুক্তভোগী লোকজন অভিযোগ করেন, স্থানীয় চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রিংকু করিম, জাহিদ হোসেন ও ইলেকট্রিক মালামাল ব্যবসায়ী আজগর শেখসহ আরো কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তারা কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পুরো ইউনিয়নজুড়ে গ্রাহকদের জিম্মি করে ফায়দা লুটে নিচ্ছেন। তবে সিন্ডিকেট প্রধান রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল নিজের বিরুদ্ধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত নন বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান।

এদিকে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়ে কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (সংশ্লিষ্ট এলাকা) এবিএম মিজানুর রহমান জানান, বিদ্যুতায়ণ প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধনের কথা রয়েছে। দ্রুতগতিতে এর কাজ এগিয়ে চলেছে। ডিজিএম মিজানুর রহমান বলেন, ওইসব এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির লোক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির প্রতিনিধিত্বের কোনো সুযোগ নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্সে থাকবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। গ্রাহকদের বিদ্যুৎ অফিসে সরাসরি যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা দুই ইউনিয়ন রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারীর ২৪২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নতুন লাইন টেনে শতভাগ বিদ্যুতায়ণ সম্পন্নে পুরোদমে কাজ এগিয়ে চলেছে। প্রথম পর্যায়ে সাড়ে ৮ হাজার পরিবারকে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রকল্পটি চলমান থাকবে। ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রত্যাশী অন্তত ২৫ হাজার পরিবার রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ইতোমধ্যে উপজেলার ডাংমড়কা এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের সাব-স্টেশন বসানো হয়েছে। সেখান থেকে ওই দুই ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করা হবে। গ্রামের পর গ্রাম মেঠো পথ ধরে বসেছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। জুড়ে দেয়া হয়েছে সঞ্চালনের তারও। এখন শুধু সংযোগের অপেক্ষা চরাঞ্চলবাসীর। চলতি বছরেই অপর ইউনিয়ন চিলমারীর বাকি কাজ সম্পন্ন হবে, পৌঁছে যাবে চরাঞ্চলের মানুষের কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ সংযোগ। অবসান হবে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার।

স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সরওয়ার জাহান বাদশাহ বলেন, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম ছিলো চরাঞ্চলের ওই দুই ইউনিয়নে শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছানো। সেটি এখন বাস্তবায়নের পথে। আশা করছি, ২০২০ সালের মধ্যেই বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হবে চরাঞ্চলের গ্রামগুলো।

সংসদ সদস্য সরওয়ার জাহান বাদশাহ বলেন, কেউ কেউ সেখানে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করছেন বলে শুনেছি। তবে এ ধরনের কোনো সুযোগ দেয়া হবে না। যারা ইতোমধ্যে নিজেদের ফায়দা হাসিলের জন্য সরকারের এই উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।