ভুয়া কাবিনে কিশোরীকে বিয়ের পর যৌতুক আদায়, অতঃপর…

ভুয়া কাবিনে বিয়ের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার কিশোরী খাদিজা ও তার মা শেফালি খাতুন।

স্ত্রী মারা যাওয়ায় তার কিশোরী বোনকে (শ্যালিকা) কৌশলে ভুয়া কাবিনে বিয়ের পর জোর করে যৌতুক আদায় করেছে মাসুম (২৫) নামে এক প্রতারক যুবক। ওই প্রতারকের দাবি করা যৌতুকের টাকা দিতে কিশোরীর পরিবারকে বিক্রি করতে হয়েছে শেষ সম্বল বসতভিটে। কিন্তু টাকা গ্রহণের পর ওই প্রতারক এখন ভোল পাল্টেছে। বেশ কয়েক মাস এক সঙ্গে থাকার পরেও কিশোরী শ্যালিকা খাদিজাকে বিয়েই করেনি বলে দাবি করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে প্রতারক মাসুম। প্রতারণার শিকার কিশোরী খাদিজার ঠাঁই হয়েছে অন্যের জমিতে কোনো মতে আশ্রয় নেয়া বাবা-মায়ের কাছে। কিশোরীর অসহায় পরিবারটি সহায় সম্বল সবকিছু হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। চাইলেও মেলেনি সুবিচার। ঘটনাটি ঘটেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের বেগুনবাড়ি গ্রামে।

জানা যায়, উপজেলার বেগুনবাড়ি গ্রামের শফিকুল ইসলামের বড় মেয়ে জুলেখার সাথে তিন বছর আগে পারিবারিকভাবে পিয়ারপুর ইউনিয়নের জয়ভোগা গ্রামের আজমল হোসেনের ছেলে মাসুমের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় জুলেখাও কিশোরী ছিল। অভাব অনটনের কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তার বিয়ে দেয়া হয়। বিয়ে হওয়ার দুই বছর পরে জুলেখার কোলজুড়ে আশে এক পুত্রসন্তান। কিন্তু সন্তান জন্ম দেয়ার এক মাসের মধ্যে বাল্যবিয়ের কারণে জুলেখা মারা যায়।

জুলেখা মারা যাওয়ার পরপরই তার স্বামী মাসুম কিশোরী শ্যালিকা খাদিজাকে ভুয়া কাবিনের মাধ্যমে বিয়ের জন্য ফন্দি আঁটে। মাসুমের পরামর্শে তার পিতা আজমল হোসেন ১৩ বছর বয়সী ছোট মেয়ে খাদিজার সাথে মাসুমকে বিয়ে দেয়ার জন্য বেয়াই শফিকুল ইসলামকে প্রস্তাব দেন। কিন্তু প্রথমবার অপ্রাপ্ত বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তটি তার জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ানোয় শফিকুল ইসলাম ছোট মেয়ে খাদিজার বিয়ের বেলায় সেই একই ভুল করতে রাজি হননি। তিনি অপ্রাপ্ত বয়সে খাদিজাকে বিয়ে দেবেন না বলে তার বিয়ের প্রস্তার প্রত্যাখ্যান করেন।

পরে শফিকুল ইসলামের নাতি (মৃত জুলেখার ছেলে) খুব অসুস্থ বলে তাদের বাড়িতে খবর পাঠানো হয়। দুধের শিশুটির অসুস্থতার কথা শুনে শফিকুল ইসলামের স্ত্রী শেফালি খাতুন ছোট মেয়ে জুলেখাকে সঙ্গে নিয়ে নাতিকে দেখতে যান। কিন্তু জামাই মাসুমের বাড়িতে গিয়ে তারা ভিন্ন চিত্র দেখতে পান। নাতির অসুস্থ হওয়ার খবর দিয়ে সেখানে তাদের পরিকল্পিতভাবে ডেকে নেয়া হয়। কিশোরী মেয়ে খাদিজার সাথে মাসুমের বিয়ে দেয়ার জন্য আতিয়ার রহমান নামে স্থানীয় এক নেতার মাধ্যমে নানাভাবে তাকে প্রলুব্ধ করা হয়। এমনকি আগেই অসম্মতি জানানোয় খাদিজার পিতা শফিকুল ইসলামকেও বিষয়টি জানাতে নিষেধ করা হয়। ওইদিনই অপ্রস্তুত খাদিজার সাথে ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাসুমের ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ হয়ে যায়। কিন্তু সেই বিয়েটি ছিল ভুয়া কাজির মাধ্যমে ভুয়া কাবিনে।

৯ মাস আগে হওয়া ভুয়া কাবিনের সেই বিয়ের পর দুই মাস যেতে না যেতেই প্রতারক মাসুম যৌতুকের জন্য খাদিজার ওপর চাপ শুরু করে। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে তার বাবা শেষ সম্বল দেড় কাঠা জমির বসতভিটে বিক্রি করে যৌতুকের ৬০ হাজার টাকা জামাইয়ের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। তারপরেও সংসার করা হয়ে ওঠেনি খাদিজার। যৌতুক নেয়ার মাস সাতেক পর বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করে খাদিজাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় প্রতারক মাসুম। সে খাদিজার বাবা-মাকে জানিয়ে দেয়, তাদের মেয়ে খাদিজার সাথে তার বিয়েই হয়নি। যার কোনো প্রমাণই নেই। এদিকে প্রতারণার শিকার হয়ে খাদিজা আশ্রয় নিয়েছে অন্যের জমিতে কুঁড়েঘর তুলে কোনো মতে বসবাসকারী বাবা-মায়ের কাছে। তাদের এখন মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

খাদিজার বাবা শফিকুল ইসলাম জানান, বাল্যবিয়ের কারণে বড় মেয়ে জুলেখা তার এক মাস বয়সী শিশুপুত্রকে রেখে অকালেই মারা যায়। তাই একই পরিণতির আশঙ্কায় ছোট মেয়ের সাথে জামাই মাসুমের দ্বিতীয় বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমি বিয়েতে রাজি না হওয়ার কারণে আমার স্ত্রী ও ছোট মেয়েকে কৌশলে তাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে এই বিয়ে পড়িয়ে নেয়। কিন্তু এখন তারা বলছে খাদিজার সাথে নাকি মাসুম বিয়েই করেনি। যৌতুকের নামে ভিটে বেচার টাকাগুলো হাতিয়ে নেয়ার জন্যই বিয়ের নাটক সাজানো হয়েছে।’

খাদিজার মা শেফালি খাতুন জানান, বড় মেয়ে মারা যাওয়ার পর তার শিশুসন্তান (নাতি) অসুস্থ বলে তাকে ও ছোট মেয়েকে (খাদিজা) কৌশলে জামাইয়ের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। কিস্তু তারা গিয়ে দেখেন নাতি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। ওই গ্রামের (জয়ভোগা) স্থানীয় নেতা আতিয়ার ছোট মেয়ে খাদিজার সাথে মাসুমের বিয়ে দেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেন। তার সহযোগিতায় তারা কৌশলে এই বিয়ের কাজ সেরে নেয়। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি তারা ভুয়া কাজির মাধ্যমে নামেমাত্র বিয়ে পড়িয়েছে।

কূটকৌশল করে একজন নাবালিকা মেয়েকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়ার মূলহোতা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আতিয়ার রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, বিয়ের সময় আমি সেথানে ছিলাম না, আমার নামে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। অথচ তার প্ররোচণা এবং উপস্থিতিতে এই বিয়ের নাটক মঞ্চস্থ করা হয় বলে ভুক্তভোগী পরিবারটির দাবি।

প্রতারক মাসুমের বাবা আজমল হোসেন বলেন, অন্য পরিবারের কোনো মেয়েকে ছেলের দ্বিতীয় বউ করে ঘরে আনা হলে তার বাচ্চাটি হয়তো ঠিক মতো আদর যত্ন পাবে না, এই দুধের শিশুটির কথা বিবেচনা করে আমি পুনরায় ওই পরিবারেই ছেলেকে বিয়ে দিতে প্রস্তাব করেছিলাম। তবে ভুয়া কাবিননামা এবং যৌতুকের বিষয়ে আমার কিছু জানা নাই। এ বিষয়ে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলে সেই ভালো বলতে পারবে।

প্রতারণার শিকার অসহায় পরিবারটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে নানা জায়গায় ঘুরলেও কোনো লাভ হয়নি। টাকার অভাবে থানা অথবা আদালতে গিয়ে আইনের আশ্রয় নিতে পারেনি। এ ব্যাপারে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এলাকার লোকজনের পরামর্শ মোতাবেক অবশেষে তারা এখানকার সাংবাদিকদের স্মরণাপন্ন হন। অন্যদিকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ বিষয়ক সালিশ কেন্দ্রে একটি অভিযোগ করেছেন তারা।

বিয়ের নাটক সাজিয়ে জোর করে যৌতুক আদায়কারী প্রতারক মাসুম।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রতারণাকারী মাসুমের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে সে প্রথমে এড়িয়ে যাচ্ছিল। কথা বলতেই রাজি হচ্ছিল না। পরে একপর্যায়ে মাসুম জানায়, খাদিজার সাথে তার বিয়ের কোনো কাবিননামা নেই। তাই বিয়ের বিষয়টি প্রমাণ করা যাবে না। আর বিয়ের ঘটনা প্রমাণ করতে না পারলে যৌতুকের ঘটনাও মিথ্যা প্রমাণিত হবে। এ সময় ধুরন্ধর মাসুম আরো জানায়, তার নামে মেয়ে পক্ষ থেকে ব্র্যাকের সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে যে অভিযোগ করা হয়েছে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্র্যাক কর্তৃপক্ষ যেই সিদ্ধান্ত বা রায় দেবেন সেটাই মেনে নেয়া হবে।

এ ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা বলেন, প্রতারক মাসুম সবকিছু জেনেও একজন গরিব মানুষের নাবালিকা মেয়েকে কৌশলে বিয়ের নাটক করলো, আবার তাদের শেষ সম্বল বসতভিটে বিক্রি করিয়ে যৌতুকের টাকা নিল। সহায় সম্বল হারিয়ে এই পরিবারটিকে পথে বসতে হলো। সংসার করতেও পারলো না অসহায় পরিবারের মেয়েটি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক মন্তব্য করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রতারক মাসুমের কঠোর শাস্তি দাবি করেন এলাকাবাসী।