নিজের সেবায় ব্যস্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা

অভিযুক্ত উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেন।

তৃণমূল জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা, দক্ষতা উন্নয়ন, বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাতা প্রদান, জীবনমান উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দেশের সমাজসেবা অধিদপ্তর। কিন্তু কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ঘটছে এর উল্টো ঘটনা। সমাজসেবার বদলে নিজের সেবায় ব্যস্ত রয়েছেন এখানকার সমাজসেবা কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেন। আর এ জন্য গড়ে তুলেছেন দালাল সিন্ডিকেট। ভাতা প্রত্যাশীদের সরকারি এসব সুবিধা পাইয়ে দেয়ার নাম করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ বাণিজ্যের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে এই উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

সমাজসেবা কর্মকর্তার গড়ে তোলা দালাল সিন্ডিকেট কাজ করছে ইউনিয়নভিত্তিক। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নেই রয়েছে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। সিন্ডিকেট সদস্যদের ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা দিলে তবেই মেলে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, বিধবা ও বয়স্ক ভাতার কার্ড। অসহায় মানুষেরা এই কার্ড পেতে নিজেদের কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে দিচ্ছেন সমাজসেবা কর্মকর্তার দালালদের হাতে। আবার টাকা দেয়ার পরেও অনেককে বছরের পর বছর ধরে কার্ডের জন্য ঘোরানো হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টাকা না দিলে মেলে না কোনো কার্ডই। তাই বাধ্য হয়েই টাকা দিয়ে কার্ড করছেন তারা। ক্যান্সার, কিডনিসহ আরো কিছু জটিল রোগীদের জন্য সরকারি অনুদানের টাকা নিতেও নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন দিয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তার মন জয় করতে হয়। এ ছাড়া টাকা দেয়ার ১ বছর পেরিয়ে গেলেও অনেকের কার্ড এখনো দেয়া হয়নি বলে অ্রভিযোগ রয়েছে। টাকা দিয়ে কার্ড পাওয়া একাধিক ব্যক্তি জানান, স্থানীয় দালাল সেলিম মেম্বার ও রতন মণ্ডলের হাত দিয়ে ১০ হাজার টাকা করে খরচ দেয়ার পরে তারা কার্ড হাতে পেয়েছেন।

উপজেলার ধর্মদহ এলাকার শাহানারা, হামিদা খাতুন, রিপন ইসলাম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কিশোর হুসাইনের পিতা হাবিবুর রহমানের মতো প্রায় সব এলাকার ভাতা প্রত্যাশীদের অনেকেই দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। রুবিয়া খাতুন নামে এক নারীর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্বামীর জন্য কার্ড হলেও খরচ দেয়া লেগেছে নগদ দশ হাজার টাকা। কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করে আসা দালাল চক্রের সদস্যরা নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের লোক পরিচয় দিয়ে দাপট দেখানোয় ভাতা প্রত্যাশী ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ খোলার সাহস করেন না।

সমাজসেবা কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেনের অর্থলোভের কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যউন্নয়নে সরকার গৃহীত মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়ন এ উপজেলায় চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুষে নেয়া হচ্ছে অসহায় মানুষজনের কষ্টে জমানো টাকা। অনেকে ঋণ নিয়েও তাদের দাবি মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন। ভুক্তভোগীরা বলছেন, উপজেলা সমাজসেবা অফিসের কর্মচারীদের মধ্যে কেউ কেউ জড়িয়ে আছেন উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে সক্রিয় থাকা দালাল চক্রের সাথে। এসব কারণে সমাজসেবায় সরকারের নেয়া এসব মানবিক কর্মসূচির সুফল পাচ্ছে না দৌলতপুর উপজেলার মানুষ।

জুয়েল নামে স্থানীয় এক যুবক জানান, তার পরিচিত উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের ইদ্রিস আলী নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে স্মার্টকার্ডের জন্য সমাজসেবা অফিসের মাঠকর্মী মশিউর রহমান ২ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু মাসের পর মাস ঘুরলেও তার কার্ডটি দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। মাঠকর্মী মশিউর বিভিন্ন এলাকার অসহায় মানুষকে প্রতিবন্ধী, বিধবা ও বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেয়ার কথা বলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর ওই টাকার বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেনের পকেটে।

দৌলতপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিস।

দপ্তর সংশ্লিষ্ট এলাকার নানা পেশায় কর্মরতরা জানান, বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাতা প্রত্যাশীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের ঘটনা এখন নতুন নয়। সমাজসেবা কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেন এ উপজেলায় যোগ দেয়ার শুরু থেকেই (গত তিন বছর ধরে) এই অবৈধ অর্থ বাণিজ্যের তৎপরতা চলে আসছে। তার নিয়োগ করা দালাল সিন্ডিকেট ভাতা প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্তদের কাছে নানা প্রলোভনে হাতিয়ে নিচ্ছেন মাথা পিছু ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। কারো কারো খরচ আবার আরো বেশি লাগছে।

এ ছাড়া সিন্ডিকেটের বাইরে পড়ায় ভাতা প্রত্যাশীদের অনেকের আবেদনের ফাইল গায়েব হয়ে যাওয়ার তথ্যও মিলেছে। কর্মকর্তার দাবি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় উপজেলার পিয়ারপুর ও ফিলিপনগর ইউনিয়নের অনেকের আবেদনের ফাইল সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। দপ্তর প্রধান ছানোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে দরিদ্র শ্রেণির অসহায় মানুষকে তাদের ন্যায্য সুবিধা প্রাপ্তি থেকে নাজেহাল করে আসলেও এর কোনো প্রতিকার মিলছে না।

সমাজসেবা কর্মকর্তার নিয়োগ করা দালাল সিন্ডিকেটের সদস্য ধর্মদহ গ্রামের রতন মণ্ডল তার বিরুদ্ধের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। কার্ড করে দেয়ার কথা বলে কারো নিকট থেকে টাকা নেয়া হয়নি, টাকা নিয়েছি ধার হিসেবে। তবে ভুক্তভোগীরা বলেন, ধার নয়, ভাতার কার্ড করার নামেই টাকা নিয়েছেন রতন।

দুর্নীতিগ্রস্ত এই কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দফায় দফায় খবর বের হলেও তিনি সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের ম্যানেজ করে বহাল রয়েছেন, অবলীলায় চালিয়ে যাচ্ছেন এসব অপকর্ম। সমাজসেবা কর্মকর্তার কারণে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সরওয়ার জাহান বাদশার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। সংসদ সদস্য বাদশাহ একাধিকবার সমাজসেবা কর্মকর্তাকে সতর্ক করে দিলেও তিনি খোদ সাংসদকেও খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না। এ কারণে এই সমাজসেবা কর্মকর্তার খুঁটির জোর নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য নেয়ার জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ছানোয়ার হোসেনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাইরে কারা কী করছে সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। এ সময় অভিযোগ অস্বীকার করলেও তার কথার ভেতরে দুর্বলতা প্রকাশ পায়। একপর্যায়ে তিনি বলেন, সব কথা তো ফোনে বলা যায় না। অফিসে আসেন দুই ভাই বসে চা খেতে খেতে আলাপ করি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার সাংবাদিকদের জানান, কার্ড দেয়ার জন্য ভাতা প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সমাজসেবা অধিদপ্তর, কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক রোকসানা পারভিন বলেন, তার (ছানোয়ার হোসেন) নামে এমন অভিযোগ মৌখিকভাবে শুনেছি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। কিন্তু কোনো লিখিত অভিযোগ আমরা পাইনি। তারপরেও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

০৫ অক্টোবার, ২০২০ at ২১:১৬:৪২ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আক/আরআই/এমএএস