চিনিকলের কাছে পাওনা ১৬ কোটি টাকা : আখ চাষে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে চাষিরা

আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন রাজশাহী জেলার চাষিরা। বিকল্প ফসল চাষাবাদে ঝুঁকেছেন আখ চাষিরা। এই পরিস্থিতিতে ধুকেধুকে চলছে রাজশাহী চিনিকল। চাষিদের দাবি, অনেকটাই অব্যবস্থাপনায় এমন করুণ অবস্থা হয়েছে চিনিকলের। চিনিকল সংশ্লিষ্টদের চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ ভালো নেই। আখ বিক্রির কুপন পেতে দেরি হওয়া। আখ বিক্রির পরে টাকা উত্তোলনে জটিলতা মূল কারন। বলছেন আখচাষিরা ।

রাজশাহী চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০২০ মৌসুমে মাত্র ৯১ দিনে চিনি উৎপাদন হয়েছে সাড়ে চার হাজার মেট্রিক টন- যা অবিক্রিত রয়েছে। আর চাষির পাওনা রয়েছে প্রায় ১৬ কোটি টাকা। কর্মচারী শ্রমিকদের বকেয়া বেতন রয়েছে তিন মাসের।

অভিযোগ রয়েছে- প্রতিবছর দেরিতে আখ ক্রয় করে চিনিকল কর্তৃপক্ষ। তারা ঠিক মতো আখ বিক্রির কুপন সরবরাহ করে না। এনিয়ে ফিল্ডম্যানদের কাছে দিনের পর দিন ধর্ণা দিতে হয় চাষিদের। তার পরেও পাওয়া যায় না সোনার হরিন কুপন। বিভিন্ন সময় এই কুপন বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। চিনিকলের ফিল্ড অফিসাররা ঠিকমতো যোগাযোগ রাখেন না চাষিদের সঙ্গে। তারা অনেকটাই অফিসে বসে আখচাষের জরিপ করেন। এমন ঘটনায় ঘটে আসছে বছরের পর বছর।

আরো পড়ুন :
করোনা পরিস্থিতিতে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে রাজশাহী তথ্য অফিস
রাজশাহীতে স্বাস্থ্যকর্মীসহ চারজনের করোনা শনাক্ত
চৌগাছায় এক পোশাক শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত

রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম সেলিম জানান, গত সাত থেকে ১০ বছরে আখচাষির সংখ্যা কমে ৫২ হাজার থেকে বর্তমানে ১৬ থেকে ১৭ হাজারে দাঁড়িয়েছে। বাকি চাষিরা জমিতে অন্য ফসল চাষাবাদ করছেন।

জানা গেছে, চলতি ২০১৯-২০২০ মৌসুমে ২২ নভেম্বর শুরু হয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মিল চলেছে মাত্র ৯১ দিন। তবে অভিযোগ রয়েছে, পুরো তিন মাসের বেতন নেয়ার জন্য এতো দিন চালানো হয়েছে চিনিকল। যদি প্রতিদিন ঠিকমতো চিনিকল চালানো হতো তাহলে দুই মাস আগেই বন্ধ হয়ে যেতো।

এর আগে ২০১৮-২০১৯ মৌসুমে চিনিকলে ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ৬৭ দিন এই আখ মাড়াই চলার কথা ছিলো। কিন্তু চলে প্রায় ৫৮ দিন। চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ হাজার ২৫০ টন। আখ থেকে চিনি আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৭ শতাংশ। মিলগেটে এবার চাষিদের কাছ থেকে ১৪০ টাকা মণ দরে আখ কেনা হয়।

চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমের ৬৭ দিনে ৯৩ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৪৪৮ টন চিনি উৎপাদন হয়। ওই মৌসুমে আখ থেকে চিনি আহরণের হার ছিল ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

আখচাষি মানিক আলী ও শিমুল হোসেন জানায়, তাদের দুজনের ২৮ থেকে ৩০ গাড়ি (পাওয়ার ট্রলি) আখ চিনিকলে সরবরাহ করেন। এর মধ্যে মাত্র সাত থেকে আট গাড়ির টাকা পেয়েছেন। বাকি টাকা পড়ে আছে।
তারা বলেন- আখ চাষ করে ঘর থেকে টাকা দিতে হয়েছে শ্রমিকদের। এছাড়া জমিতে যে আখ আছে তার পরিচর্যা করা সম্ভব হচ্ছে না টাকার অভাবে। এনিয়ে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের।

আখ বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন- আখ বিক্রির কুপন চিনিকলে ঘুরে ঘুরে নিতে হয়েছে। ফলে জমিতে অনেক আখ নষ্ট হয়ে গেছে। চিনিকলের ফিল্ডম্যানরা ঠিকমতো আসেন না জমিতে। বর্তমানের আখের টাকার বিষয়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষ চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মেজবাউল ইসলাম জানান, চিনিকলে সবমিলে প্রায় সাড়ে ৮০০ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। এর মধ্যে স্থায়ী ৩৫০ জন, মৌসুমি ৩৫০ জন, চুক্তিভিত্তিক ১৫০ জন। এছাড়া বাকিগুলো কর্মকর্তা রয়েছেন।

তিনি বলেন, তাদের চার মাসের বেতন বাকি আছে। এনিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা মানবতর জীবনযাপন করছেন। তারা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে চিনিকল বন্ধ। এছাড়া আগের বেতন বকেয়া রয়েছে। সব মিলে আসন্ন ঈদে পরিবার নিয়ে কী করবেন তা নিয়ে দুচিন্তায় রয়েছেন তারা।
রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম সেলিম জানান, এই মৌসুমে চিনি মজুদ আছে সাড়ে চার হাজার মেট্রিকটন। আমরাও চেষ্টা করছি শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন দেয়ার জন্য।

তিনি আরো জানান, এই চিনিকল শিল্পের সঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বেতনের জন্য ডিসি অফিসে স্মারক লিপি প্রদান করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এপ্রিল ২৯, ২০২০ at ১৮:১০:৪২ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আক/এমআর/এএডি