ভয়ঙ্কর রূপ নেবে ডেঙ্গু

করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে আরেক প্রাণঘাতী রোগ ‘ডেঙ্গু’। খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেই বলা হয়েছে, এবার এ রোগে আক্রান্তদের জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়বে। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকালে রাজধানীতে হঠাৎ হয়ে যাওয়া বৃষ্টির পানিতে আগামী ৭ দিনের মধ্যে এডিশ মশার জন্ম হবে। এই সময়ের মধ্যে মশার লার্ভা ধ্বংস করতে না পারলে ভয়ঙ্কর রূপ নেবে ডেঙ্গু। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এমন আশঙ্কার কথা উঠে আসে।

ওই সভায় আরো বলা হয়, এবারের ডেঙ্গু সারাদেশেই ছড়িয়ে যাবে। শহরে টুকটাক প্রস্তুতি থাকলেও গ্রামে কোনো প্রস্তুতি নেই। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বাররা ডেঙ্গু মশা কি এটাই চেনেন না। এ জন্য মাঠপর্যায়ে মশা মারার জন্য ডিসি, এসপি, ইউএনও ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া উচিত। একইসঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে না তুললে এ থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব নয় বলেও জানান তারা। তবে কেউ কেউ ড্রোনের মাধ্যমে সার্ভে করে এডিস মশার জন্মস্থান দেখে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলেন।

সভায় উপস্থিত থেকে দেখা গেছে, গত বছরের মতো এবারো ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে সিটি করপোরেশনই বেশি কাজ করে। কিন্তু গতকালের সভায় ঢাকার নবনির্বাচিত দুই মেয়রের একজনও ছিলেন না। অথচ কয়েকদিন আগে মেয়রদের শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়ে বলেন, মশা যেন ভোট না খেয়ে ফেলে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন তিনি।

সভার এক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক বলেন, এমনিতেই আমরা দেরি করে ফেলেছি। লার্ভা থেকে জন্ম নিয়ে একটি ব্যাচ মশা বেরিয়ে গেছে। এখন এসব মশা উড়ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে বাইরে মশার ঘনত্ব বেড়ে গেছে। এখন দ্রুত স্প্রে করতে হবে। প্রয়োজনে দুবার করে স্প্রে করার নির্দেশ দেন তিনি। এখনই এসব মশাকে নিয়ন্ত্রণ না করলে চড়া মূল্য দিতে হবে, মন্তব্য মন্ত্রীর।

ওই সভায়ই সচিব বলেন, মশার কোনো বাউন্ডারি নেই। শহর-গ্রাম সব জায়গাতেই এবার ডেঙ্গুর ঝুঁকি রয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই একে নিধন করতে হবে। এ জন্য যার যা দায়িত্ব পড়বে সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালনের জন্য অনুরোধ জানান তিনি।

আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আগামী এপ্রিল পর্যন্ত করোনার প্রভাব থাকবে। এরকম পরিস্থিতির মধ্যে অন্য মন্ত্রণালয়গুলো যদি দায়িত্ব না নেয় তাহলে ডেঙ্গু রোগকে সামলানো যাবে না। তিনি বলেন, এবার কমপক্ষে ৫০ হাজার লোক ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হতে পারে। গত বছর কতজন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিল তা নিয়ে সবাই ব্যস্ত ছিল। এবার যারা ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হবে তাদের জীবন বাঁচানো কঠিন হবে। তিনি বলেন, আগামীকাল থেকে ডেঙ্গুর বিষয়ে একটি জরিপ কাজ শুরু হবে, তারপর এ নিয়ে বিস্তারিত বলা যাবে। তবে এবার ডেঙ্গুর ভরা মৌসুমে ঈদুল ফেতর পড়বে। লোকজন ঈদে বাড়ি যাবে। সঙ্গত কারণে ঈদের সময় ডেঙ্গু শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এর আগে সভার শুরুতেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে জানতে চান, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগরে কী কী কাজ করছে সিটি করপোরেশন। এর জবাবে দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, নির্মাণাধীন মেট্রোরেলের পাত, বিআরটিসি বাসের ডিপো, ওয়াসার পানির বাক্স, থানায় সিজ করে আনা গাড়িতে পানি ও টায়ারের দোকানে বাইরে ঝুলিয়ে রাখা টায়ারে পানি জমে ডেঙ্গু মশার রোগ সৃষ্টিকারী এডিস মশার জন্ম নেয়। খুব তাড়াতাড়ি এসব জায়গায় মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে। এর জবাবে মন্ত্রী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান, কারা উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করবে? সিটি করপোরেশনেরই উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করার কথা। সিটি করপোরেশন কী কাজ করছে- মন্ত্রীর এমন প্রশ্নের জবাবে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা লম্বা একটি ফিরিস্তি দিয়ে জানান কাজ চলছে। একইসঙ্গে সচেতনতামূলক কাজও হচ্ছে।

এরপরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল ইসলাম বলেন, গত বছর যেসব মশা ডিম দিয়েছে গতকালের বৃষ্টি সেই ডিমগুলো লার্ভা হয়ে যাবে। এরপরই মশার জন্ম হবে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে এসব লার্ভা ধ্বংস করতে না পারলে ভীষণ ক্ষতি হবে। সারাদেশের প্রতিটি পাড়া/মহল্লায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কমিটি গঠন করার কথা বলেন তিনি। এই কমিটি যেখানে পানি জমে থাকবে সেই পানি ফেলে দেয়ার জন্য কাজ করবে। তবেই কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে।

সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জানান, থানায় সিজ করা গাড়িতে যাতে কোনো ধরনের পানি জমে না থাকে সে বিষয়ে ঢাকা মহানগরের প্রত্যেক থানায় চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা দেয়া হবে। এর জবাবে স্বাস্থ্যসচিব বলেন, গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আয়োজিত ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছিল তাতেও সিজ করা গাড়ির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত পুলিশ বাস্তবায়ন করেনি। এবার যাতে এমনটি না হয় সে বিষয়ে কড়া দৃষ্টি দিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি বলেন, ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জন্ম নিতে না পারে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড্রোনের মাধ্যমে সার্ভে করে এডিস মশার উৎপত্তিস্থল জানার কথা বলেন।