কড়া নাড়ছে ৪০ তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আপনার প্রস্তুতি …

লেখক- নাজমুল হাসান, নেভাল ডিফেন্স ক্যাডার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

দুয়ারে কড়া নাড়ছে ৪০ তম বিসিএস-এর লিখিত পরীক্ষা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের লিখিত পরীক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে দেশ দর্পনের পক্ষ থেকে আজ থাকছে তুলনামূলক রাজনীতি বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। পিএসসির সিলেবাসে যেটি ফ্রেঞ্চ মডেল নামেই পরিচিত। অর্থাৎ, ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত। গুরুত্বপূর্ণ এ লেখাটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও নিউ মডেল বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক প্রভাষক এবং বর্তমান নেভাল ডিফেন্স ক্যাডার সার্ভিসে কর্মরত জনাব নাজমুল হাসান। আশা করি বিসিএস, শিক্ষক নিবন্ধন সহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রিলিমিনারি, রিটেন ও ভাইবার জন্য এ লেখাটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থা:
‘ফ্রান্স’- বিশ্ব রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী রাষ্ট্র। বিশ্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য, সৃষ্টির আয়োজন কিংবা হাজারও বিয়োগ ব্যথার স্মৃতি চিহ্ন, স্থাপত্য শৈলীর অন্যান্য নিদর্শন, রক্তাক্ত সংঘাত আর কিংবদন্তি সহ নানান ঘটনা ঐতিহ্যের এক সরব সাক্ষী এই ফ্রান্স, পাতায় পাতায় তার ইতিহাসের মুক্ত মঞ্চের বিচিত্র কতনা লেখা চিত্র।
ভৌগোলিক ভাবে ফ্রান্স উত্তর ও উত্তর পশ্চিমে ইংলিশ চ্যানেল দ্বারা ব্রিটেন হতে বিচ্ছিন্ন, এবং এর উত্তর ও উত্তর পূর্বে বেলজিয়াম ও জার্মানি, (বেলজিয়াম মূলত ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে অবস্থিত একটি বাফার রাষ্ট্র), পশ্চিমে সুইজারল্যান্ড ও ইতালি, দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্বে ভূমধ্যসাগর, এবং দক্ষিণ পশ্চিমে স্পেন অবস্থিত। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একটি এই ফ্রান্স। ইতিহাসে বীরের জাতি খ্যাত ফরাসিরাই ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করেছিল বলে জানা যায়। আজও ইউরোপের বাইরে ফ্রান্সের রয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওভারসিজ অঞ্চল। পৃথিবীর একমাত্র দেশ হিসেবে এখনও ফ্রান্সের-ই লাতিন আমেরিকায় একটি উপনিবেশ রয়েছে যার নাম ‘ফ্রেঞ্চ গায়ানা’। ব্রাজিলের সাথে এই ফ্রেঞ্চ গায়ানা আমাজান বনাঞ্চলেরও বেশ কিছু অংশ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। আর তাই, সাম্প্রতিককালে আমাজান বনাঞ্চলের অগ্নিকাণ্ডে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখরোর মাথা ব্যথার মূল কারণও ছিল এটি। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে ফ্রান্স তার মূল ভূখণ্ডের বাইরেও ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর এমনকি ভারত মহাসাগরেও বেশ কিছু দ্বীপের মালিকানাতেও রয়েছে। শুধু তাই নয়, ফ্রান্সের রাজনীতিতে এই অভারসিজ অঞ্চলগুলোর রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
ফ্রান্সের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী হলো প্যারিস। বিশ্ব মঞ্চে এই প্যারিস ‘সিটি অফ কালচার’ হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক যুগের সূচনায় যে রেনেসাঁ সম্পর্কে আমরা জানতে পারি, তাতে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিখ্যাত এই চিত্রশিল্পীর মাস্টার্ পিস খ্যাত মোনালিসা চিত্রকর্মটি এই প্যারিসে্য লুভর মিউজিয়ামেই শোভা পাচ্ছে। ফ্রান্সের লিও শহরে রয়েছে ইউনেস্কোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার হেডকোয়ার্টার। এলিসি প্রাসাদ (প্রেসিডেন্টের বাসভবন), আইফেল টাওয়ার ও বাস্তিল দূর্গের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাও এই প্যারিসেই বিদ্যমান। এছাড়াও ইন্টারপোলের সদরদপ্তরও ফ্রান্সের লিয়েন শহরে অবস্থিত। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে ইতিহাস ও সংস্কৃতি ঐতিহ্যে ফ্রান্স এক অনন্য নজির।
এবার নজর দেয়া যাক ফ্রান্সের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে। বিশ্ব রাজনীতির উত্থান পতন ও নানাবিধ পথপরিক্রমার সাথে ফ্রান্স এতটাই জড়িত যে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার আলোচনা করা প্রায় দুরূহ ব্যাপার। ইতালির ফ্লোরেন্সে চতুর্দশ শতকে যে রেনেসাঁর সূত্রপাত হয়েছিল তার বিস্তারে ফরাসি চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ ও ধর্মগুরুদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এখনও ফ্রান্সের ৫৭.৫% মানুষ রোমান ক্যাথলিক ধর্ম পালন করে থাকে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কথাতো একটু আগেই উল্লেখ করেছি। উল্লেখ এই রেনেসাঁর হাত ধরেই আজকের আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা সহ মৌলিক মানবাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সূত্রপাত হয়েছে। নিকোল ম্যাকিয়াভেলির হাত ধরেই যে আধুনিক জাতি রাষ্ট্রের সূচনা হয় তা মূলত এই রেনেসাঁর-ই ফল ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া শান্তি চুক্তির মাধ্যমে যে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে সার্বভৌমত্বের ধারণার সূত্রপাত হয় সেখানেও ফরাসি রাজনীতির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তৎকালীন সময়ে ফরাসি আক্রমণের ভয়ে ইতালি, স্পেন, সুইজারল্যান্ড সহ ফ্রান্সের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো সদাই চিন্তা গ্রস্থ থাকতো। যার ফলস্বরূপ এই রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব প্রচেষ্টাতেই ১৬৪৮ সালে জার্মানির ওয়েস্ট ফেলিয়া অঞ্চলে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অনেকগুলো ফলাফলের একটি ছিল, ১৬৫৯ সালে ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে পাইরিনি নামক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘ ৩০ বছর ব্যাপী যুদ্ধের অবসান ঘটা।
এরপর অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফরাসিরা বিশ্ব রাজনীতির গতি প্রকৃতি- যেন পাল্টে দেয়। এ শতাব্দীর এক ফরাসি বিপ্লব-ই (৫ মে ১৭৮৯ – ৯ নভেম্বর ১৭৯৯) বদলে দেয় বিশ্ব রাজনীতির গতি প্রকৃতি। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের পতন এবং রিপাবলিক ও লিভারেল ডেমক্রেসির বাস্তব প্রয়োগ মূলত এই ফরাসি বিপ্লবের বিজয়ের মধ্য দিয়েই শুরু হয়। একদিকে সাধারণ কৃষক মজুর শ্রেণীর মানবেতর জীবনযাপন ও অন্যদিকে ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুই এর বিশাল বহুল জীবন যাপন, একদিকে ৫% মানুষ শতভাগ সম্পদ কুক্ষিগত রেখেও কোন কর না দেয়া, অন্যদিকে ৯৫ ভাগ মানুষের এক বেলা খাবার পেতে আমৃত্যু সংগ্রাম ও কর প্রদান করা সহ দেশব্যাপী প্রচন্ড খাদ্য সংকটের কারণে নেপোলিয়নের নেতৃত্বে এই বিপ্লবের সূচনা হয়। রুশো, ভল্টেয়ার, দিদেরোর মতো সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। ১৭৮৯ সালের ৫ মে বিপ্লবের সূচনা হলেও তার চূড়ান্ত রূপ পায় ১৪ জুলাই ১৭৮৯। এ দিন সাধারণ জনতা প্যারিসের বাস্তিল দূর্গ আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে ষোড়শ লুই কে ক্ষমতাচ্যুত করে। উল্লেখ এই বাস্তিল দুর্গ ছিল ষোড়শ লুই এর টর্চার সেল। এখানেই সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে বন্দি রাখা হতো। কথিত আছে যাকে এই দুর্গে বন্দি করা হতো সে আর জীবিত ফিরে আসতো না। ১০ বছর ৬ মাস ৪ দিন ব্যাপী চলমান এই বিপ্লবের সাথে জড়িত আরও দুটো নাম না উল্লেখ করলে অনেকটা অপরাধ হবে বৈকি। এর একজন হলেন ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবস্পিয়ার। নেপোলিয়ন যদি ফরাসি বিপ্লবের সময় নেতা হয়ে থাকে, তবে এই রোবস্পিয়ার হলেন এই বিপ্লবের বেসামরিক নেতা যিনি সাধারণ মানুষের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেন যে সবাই তাকে ইনকরাপ্টিবল উপাধিতে ডাকতো। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক জ্যাকোবিন ক্লাবের অন্যতম সদস্য ও ফরাসি পার্লামেন্টেরও সদস্য ছিলেন তিনি। তার প্রচেষ্টাতেই ১৭৯২ সালে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে এবং ফ্রান্সের প্রথম রিপাবলিকের যাত্রা শুরু হয়। এছাড়াও ১৭৯৩ সালে তাঁর প্রচেষ্টাতেই ষোড়শ লুই এর শিরশ্ছেদ হয়। তিনি ফরাসি রাজতন্ত্রের পতনের পর রেইন অব টেরর নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন যা রাজতন্ত্রের সমর্থনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গণহারে গ্রেফতার ও শিরশ্ছেদ ঘটায়। এটিই শেষ পর্যন্ত তাকে অপরাধী করে তোলে এবং ফরাসি পার্লামেন্ট তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ১৭৯৪ সালে শেষ পর্যন্ত এই বিপ্লবীর শিরশ্ছেদ ঘটানো হয়। তাই তাকে ফরাসি বিপ্লবের হিরো থেকে জিরো উপাধিতেই বিশেষজ্ঞরা ভূষিত করে থাকে।

বলছিলাম দুজনের নাম না নিলে অপরাধ হবে বৈকি। আরেকজন হলেন, ফরাসি বিপ্লবের সাথে জড়িত আমাদের এই বাংলাদেশেরই চট্টগ্রামের এক বীর সন্তান। নাম তার জামর (ওরফে জমির)। ১৭৬০ সালে ইংরেজ ও ফরাসিদের মাঝে বন্দীবাসের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে ফরাসিরা পরাজিত হয় এবং উপমহাদেশে ইংরেজরা বাণিজ্য বিস্তারে অনেকদূর এগিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৭৩ সালে এক ইংরেজ ব্যাবসায়ী চট্টগ্রাম উপকূল থেকে জমির নামের ১১ বছরের এক যুবককে ক্রয় করে জাহাজ যোগে মাদাগাস্কারে বিক্রি করে দেয়। ঘটনাক্রমে ঐ যুবককে তৎকালীন ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুই দাস হিসেবে কিনে নিয় এবং তার রক্ষিতা মাদাম বারীকে তার দেখাশোনায় নিযুক্ত করেন। সেই মাদাম বারীই তার নাম জমির থেকে রাখেন ‘লুই বেনোয়া জামর’ (গ্রন্থ: দ্য ফ্রেঞ্চ আটলান্টিক ট্রায়াঙ্গাল, ক্রিস্টোফার এর মিলার)। এই জামর পরবর্তীতে ষোড়শ লুই এর শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী জনতার সাথে হাত মিলায় এবং ফরাসি বিপ্লবের বিজয়ের পর এই বালকের সাক্ষীতেই মাদাম বারীর শিরশ্ছেদ ঘটানো হয়। ১৮১৫ সালে ওয়াটার লু যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর তিনি অনেকটা জন চক্ষুর অন্তরালে চলে যান এবং ১৮২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ফরাসি বিপ্লবের পর ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একে একে আরও দুটি রিপাবলিক অতিক্রম করে (২য় রিপাবলিক- ১৮৪৮-১৮৫২, ৩য় রিপাবলিক- ১৮৭০-১৯৪০)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬-১৯৫৮ পর্যন্ত চতুর্থ রিপাবলিক এবং প্রেসিডেন্ট গলের হাত ধরে ১৯৫৮ পঞ্চম রিপাবলিকেল সূচনা হয় যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান। উল্লেখ ৩য় ও চতুর্থ রিপাবলিকে ফ্রান্স ছিল পার্লামেন্টারি শাসনের অধীনে এবং ৫ম রিপাবলিক থেকে বর্তমান পর্যন্ত ফ্রান্স রয়েছে Unitary Semi Presidential Constitutional Republic এ। অর্থাৎ বর্তমান ফ্রান্স মূলত আধা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা অনুসরণ করে থাকে।
ফ্রান্সের বর্তমান সরকার ব্যবস্থা:
সাংবিধানিক ভাবে ফ্রান্স মূলত French Republic নামে পরিচিত। এর সরকার ব্যবস্থা মূলত আধা রাষ্ট্রপতি শাসিত। ফ্রান্সের আইনসভার নাম পার্লামেন্ট। এটি Bicameral parliament (দ্বি কক্ষ বিশিষ্ট) যার উচ্চ কক্ষের নাম সিনেটে (সদস্য ভেরি করে) এবং নিম্ন কক্ষের নাম National Assembly (সদস্য ৫৭৭ জন)। সিনেটের সদস্যরা ইলেকট্রোরাল কলেজ কর্তৃক ৬ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবে প্রতি তিন বছর পর পর অর্ধেক সদস্যের মেয়াদ শেষ হয়। অন্যদিকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্যরা পাঁচ বছরের জন্য স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবে এই নির্বাচন সাধারণত ফাস্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেমে হয় না। বরং এখানে অনুসরণ করা হয় Run off voting system বা second ballot system। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক:
Fast Past the Post system বা winner takes all system এ একজন প্রার্থী মোট ভোটার সংখ্যার ৫০% এর বেশি ভোট না পেয়েও নির্বাচিত হতে পারেন। সর্বশেষ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা এরূপ দেখতে পেয়েছি। আবার বাংলাদেশর জাতীয় নির্বাচনেও এটি দেখতে পাওয়া যায়। ধরা যাক একটি জেলায় পাঁচনজন প্রার্থী একটি আসনের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ালেন। মোট ভোটের মধ্যে প্রথম প্রার্থী পেল ৩০%, দ্বিতীয় জন পেল ২৯%, তৃতীয় জন পেল ২৫%, চতুর্থ প্রার্থী পেল ১০% এবং পঞ্চম প্রার্থী পেল ৬% ভোট। এই ১০০% শতাংশ ভোটের মধ্যে প্রথম প্রার্থী মাত্র ৩০% ভোট নিয়ে বিজয়ী হয়ে গেল এবং একি সাথে ইউনার টেক্স অল নীতিতে এই বিজয়ী প্রার্থী বাকি চারজনের ৭০% ভোটও অলিখিত নিয়মে নিয়ে নিল। অর্থাৎ বাকি ৭০% ভোটের কোন মূল্য থাকলো না। অথচ গণতান্ত্রিক নিয়মে তার নূন্যতম ৫০%+১ টি ভোট দরকার ছিল নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার। অথচ সে ৩০% ভোট পেয়েই নির্বাচিত হয়ে গেলেন। একেই বলে Fast past the post system।
এবার আসা যাক ফ্রান্সের রান অফ ভোটিং সিস্টেমে:
ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সহ সংসদের নির্বাচনে রান অফ ভোটিং সিস্টেম পদ্ধতি ব্যবহার হয়। একে second ballot system ও বলা হয়। এই নীতিতে একজন প্রার্থীর ফাস্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেমের মতো ৩০% ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। এই নিয়মে প্রথম ধাপে যদি কোন প্রার্থী ৫০% এর বেশি ভোট না পেলে সর্বাধিক ভোট প্রাপ্ত দুজনের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ধরা যাক উপর্যুক্ত উদাহরণ থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ায় এদের মধ্যে আবারও দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন হবে এবং যেকোন এক প্রার্থীকে অবশ্যই ৫০% এর বেশি ভোট নিয়েই বিজয়ী হতে হবে। একেই বলে রান অফ ভোটিং সিস্টেম।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণ প্রত্যক্ষ ভোট প্রদান করে (Direct Popular Vote)। এছাড়াও ৩০ টি বিশেষ ডিপার্টমেন্ট এবং ওভারসিজ অঞ্চল হতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের (অধিকাংশই মেয়র পদবীধারী)মধ্যে থেকে নূন্যতম ৫০০ জনের সম্মতি দরকার হয়, একে বলে sign nomination or sponsorship। ফ্রান্সের সরকার ব্যবস্থার এক ইউনিক বিশেষত্ব হলো এখানে দ্বৈত নির্বাহী পদ্ধতি (Dual Execution system) বিদ্যমান। অর্থাৎ, এখানে প্রেসিডেন্টের একক চরয় ক্ষমতা নেই। বরং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পার্লামেন্টও প্রভূত ক্ষমতাযর অধিকারী এবং প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট উভয়কেই পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। আর এ কারণেই একে Semi Presidential Constitutional Republic বলা হয়। সংসদে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে প্রেসিডেন্ট যে সেই দলের-ই সদস্য হবে এর কোন নিশ্চয়তা এখানে নেই। আর এরূপ হলে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে ফোর্সড করে তার ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে। এটি সাথে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ক্যাবিনেট প্রচুর ক্ষমতা ধারন করতে পারে যাতে প্রেসিডেন্ট সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এরূপ অবস্থাকে রাজনীতির ভাষায় বলা হয় পলিটিক্যাল কোহেবিটেশনের। তবে সার্বিকভাবে ফরাসি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিম্নরূপ:
পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের আস্থাভাজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দান।
পার্লামেন্টের অনুমোদন নিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়োগ দেয়া।
পার্লামেন্টের অনুমোদন নিয়ে প্রধান বিচারপতি সহ অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগ দেয়া।
সংসদ প্রণীত আইনে চূড়ান্ত অনুমোদন।
সংসদ আহ্বান ও ভেঙে দেয়া।
প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে কোন চুক্তিকে গণভোটে দেয়া।
প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার অনুমোদন দেয়া।
ওভারসিজ অঞ্চলের প্রধানদের নিয়োগ দেয়া।
এবং ডমেস্টিক সকল বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে কাজ করা।
অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের অনেক কাজ-ই সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নির্ভর।
ফ্রান্সের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা:
ফ্রান্সের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুই স্তরের। প্রথমটি Metropolitan France (মূল ফ্রান্স/ইউরোপের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল)। এটি আবার তিন স্তরে বিভক্ত: ক) Communes (36000 টি) এর প্রধান Municipal council & Mayor। খ) Departments (96টি)- এর প্রধান General council & president of department। গ) Region (18টি)- এর প্রধান Regional council and president of region।
দ্বিতীয় স্তরের নাম- Overseas territorial government। এটি মূলত ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের বাইরের অংশ। সাধারণ একজন গভর্নর বা মেয়র এর প্রধান। গুরুত্বের বিচারে এটি তিন স্তরে বিভক্ত: ক) overseas possession, খ) overseas region, গ) overseas territory।
এই ছিল ফ্রান্সের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট ও স্বরূপ। ইতিহাসের নানা গতিপ্রকৃতি পেরিয়ে ফ্রান্স আজ বিশ্ব রাজনীতির এক অনন্য শক্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের কেতেন নামক অঞ্চলের জঙ্গলে এক রেলগাড়িতে জার্মানি মূলত ফরাসি জেনারেল ফসের কাছেই আত্মসমর্পণ করেছিল। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে জড়িত ঐতিহাসিক V-Day (6 June)-এর সাথেও ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূল জড়িত। এভাবেই যুগে যুগে ফরাসিরা নিজেদের বীরত্বের সাক্ষর রেখেছে বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গ মঞ্চে।

লেখক- নাজমুল হাসান
নেভাল ডিফেন্স ক্যাডার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
BSS, MSS, Political Science, DU
Ex-Lecturer: New Model University, Dhaka.