দাদির সাথে মালয়েশিয়ায় ভ্রমণ

বিকেলবেলা রুমে বসে বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছিলাম। এমন সময় আমার বাবা এসে বললো তোমার দাদু আর দাদুরা ৩ বোন মালেশিয়া বেড়াতে যাবে। তুমি কি উনাদের সাথে যাবে? যেতে চাইলে দাদুর সাথে আলাপ কর।যেই কথা সেই কাজ, দাদুকে ফোন দিতেই দাদু বলে তুমি গেলে তো খুবই ভালো হয়। ভিসার জন্য যা যা প্রসেসিং তা শুরু করে দাও। আমার ভিসা হয়ে গেলো ৫ জানুয়ারি সকাল ১১.৩০ ঘটিকা গধষরহফড় আইরলিনেস এ ফ্লাইট।

৫ তারিখ মালেয়শিয়া যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। হোটেলে চেক-ইন করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেড়িয়ে পরি রাতের খাবারের উদ্দেশ্য করে। হোটেলের পাশেই ইন্ডিয়ান একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পরি।
৬ জানুয়ারি সকাল ৭ টা মালেয়শিয়ার সময়ে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে বেরিয়ে পরি। যেহেতু আমার দাদুর বয়স ৭৩ বছর দাদুর জন্য ভ্রমণটা যতটা আরামদায়ক করা যায় তাই ট্যাক্সি আমরা আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম। প্রথমেই আমরা টুইন-টাওয়ার যাই, বাহির থেকে দেখে টিকেট কেটে নেই। টিকেট পাই ৮ তারিখ ১.১৫ মিনিটের। টুইনটাওয়ারের প্রবেশপথে দেখা মিলে একজন বাংলাদেশী ভাইয়ের সাথে যিনি মিনি ক্যামেরা বিক্রি করছিলেন ২৫ রিংগিত দিয়ে। আমি এগিয়ে গিয়ে জিগাসা করি “কি ভাই দেশী নি?” উনি বলেন ” হ আফা” সাথে একগাল হাসি আরেকটু জিগাসা করতেই নিজের থেকেই বলেন তিনি মালেয়শিয়াতে ৪ বছর ধরে আছেন কাগজপত্রের ঝামেলার জন্য দেশে ফিরতে পারছেন না। দেশের কথা খুব মনে পরে উনার। আমার ছবি টি উনি তুলে দিলেন উনার মিনি ক্যামেরা দিয়ে। দেশের লোক বলে উনি আমাকে বলেছিলেন আপা আমি এমনি ছবি তুলে দিচ্ছি। তারপর টুইনটাওয়ারে টিকেট কেটে আমরা চলে যাই মালেয়শিয়ার জাতীয় মসজিদে, পুরানা রেল স্টেশন, শহড়টা ঘুরাঘুরি শেষ করে দুপুরের খাবার খেয়ে নেই একটি বাংলা হোটেল থেকে। দাদু হোটেলে থেকে যান বিশ্রাম নেয়ার জন্য আর আমি বেড়িয়ে পরি শপিং আর মালেশিয়ার অলিগলি চেষে বেড়ানোর জন্য।
মালেয়শিয়া বাংলাদেশিদের জন্য সেকেন্ড হোম বলা হয়। প্রতি ১০০ জনে ১ জন বাংলাদেশীর দেখা মিলবে মালেয়শিয়াতে। ইংরেজি না জানলেও মালেয়শিয়া তে চলার জন্য কোন সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। প্রচুর বাংলাদেশী, পাকিস্তানি এবং ইন্ডিয়ান এখানে কাজ করে। বাংলাদেশিরা বেশির ভাগই মালেয়শিয়াতে ভালো অবস্থায় রয়েছে আমার দেখা মতে। সুপারমল থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্ট সব জায়গাতেই বাংলাদেশী আমি পেয়ে গিয়েছি।

সকাল ৬ টা ৭ জানুয়ারি আজ আমরা যাবো ইধঃঁ ঈধাবং যা মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি চুনাপাথরের পাহাড় যা গোম্বাক জেলার পুরাতন গুহা মন্দির। বাটু নদী থেকে এর নাম নেয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ভারতের বাইরে পরিচিত হিন্দু মন্দির গুলোর মধ্যে এটি একটি যা শ্বর মুরুগানের প্রতি নিবেদিত। বাটু কেভসের বয়স আনুমানিক ৪০ কোটি বছর। দক্ষিণ ভারতীয় ব্যবসায়ী কে.থাম্বুস্বামী পিল্লাই এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। বাটু কেভসের মূল আকরসন গুহা। ভূমি থেকে ১০০ মিটার উচ্চতায় গুহাগুলো অবস্থিত। তিনটি বৃহদাকারের এবং বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্রাকারের গুহা রয়েছে। সবচেয়ে বড়োটির নাম মন্দির গুহা। এর রয়েছে ১০০ মিটার উঁচু সিলিং। আমাকে মন্দিরে পৌঁছাতে ২৭২টি সিড়ি বেয়ে উঠতে হয়। দাদুর পক্ষে সিড়ি বেয়ে উপরে যাওয়া সম্ভব ছিলো না বলে দাদু গাড়িতে আমার জন্য অপেক্ষা করে আশপাশের জায়গা ঘুরে দেখে আর আমি উপরে যাই। প্রকৃতির অসম্ভব মায়া দিয়ে গুহাটি তৈরি আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর গুহা।

বাটু গুহা দেখার পর আমরা চলে যাই এবহবঃরপ ঝশু ডধু এর দিকে। ক্যাবলকারে ঘুরে কেনাকাটা করার উদ্দেশ্য আমি মার্কেটে যাই সেখানে আমার পরিচয় হয় একজন পাকিস্তানি সেলারের সাথে। আমি উর্দু বলতে পারায় সে একটু অবাক হচ্ছিলো। সে মাত্র ৬ মাস হয়েছে মালেয়শিয়া তে এসেছে। অনেক কিছুই কেনাকাটা করলাম তার দোকান থেকে। কথায় কথায় সে আমার কাছে জানতে চায় আমি পাকিস্তান কে এখন কিভাবে দেখি? আমি উত্তরে বলেছি অন্য দশটি রাস্ট্রের মতই। সে বললো বাংলাদেশী তার রুমমেট রয়েছে যার সাথে তার বন্ধুত্ব অনেক ভালো। আমাকে তার নাম্বার দিয়ে বললো যে কোন প্রয়োজনে মালেয়শিয়া থাকা অবস্থায় তাকে যেন ফোন করি।

মালেশিয়া তে চালাফেরা করার জন্য ট্যাক্সিক্যাব অথবা মনোরেল। আমার হাতে অনেক শপিং ব্যাগ ছিলো বলে মনোরেলের জন্য হেটে যাওয়া সম্ভব ছিলো না। এৎধন এর মাধ্যমে আমি ট্যাক্সি নিতে পারছিলাম না। এৎধন আমার ভেরিফিকেসন কোড গ্রহণ করছিলো না। অনেকক্ষণ ক্যাবের জন্য দাঁড়িয়ে থেকে আমি দেখতে পাই এক ইন্ডিয়ান পাঞ্জাবী ছেলে দাড়িয়ে আছেন। একটু চিন্তা করে উনার কাছে গেলাম আর জিগাসা করলাম “প্রা জি কেছে হো? মেরি থোরি হেল্প কার দো জি ” উনি ধরেই নিলো আমি ইন্ডিয়ান। জিগাসা করলো কি সাহায্য লাগবে? আমি আবারো হিন্দিতেই বলাম ” আপকে পাছ কেয়া এৎধন হে? হে তো এক ক্যাব মিলাদো। মেরে না ভেরিফিকেসন কোড লে নেহি রাহে হে ” উনি চটজলদি উনার নিজের ক্যাব বাতিল করে আমাকে ক্যাব ডেকে দেন। ক্যাব আসতে আসতে উনার সাথে কথা হয় তখন আমি আমার পরিচয় উনাকে দেই। উনি আমাকে জিগাসা করেন উনি ভেবেছিলেন আমি ইন্ডিয়ান হবো। এই পরিস্থিতিতে আমি আগেই যদি নিজের পরিচয় উনাকে দিয়ে দিতাম একজন ফরেনার কে হয়তো নিজের আই ডি থেকে ক্যাব ডেকে নাও দিতে পারতেন। কারন অনেক সময় উপকার করতে গেলেও বিপদ কে নিমন্ত্রণ দেয়া হয়ে যায়। তাই আমি কোন রিস্ক নেই নাই কারন আমার সাথে ৮/৯ কেজির মত জিনিস ছিলো। পাঞ্জাবী পথিক তার দেশীয় ভেবে আমাকে সাহায্য করে।
সন্ধ্যার পর মালেয়শিয়ার রাস্তার পাশে দেখতে পাই ওপেন কনসার্ট চলছে। সেখানে কিছুক্ষণ গান শুনি। হোটেলে ফিরার পথে একজন চিত্রশিল্পীর পেছনে দাড়িয়ে যাই যিনি মোম রং দিয়ে কত সুনিপুণ ভাবে অবিকল শিল্পীর সামনে বাসা মানুষেটার অবয়ব ক্যানভাসে তুলে যাচ্ছেন।

ঝকঝকে আকাশ, বাংলাদেশ যেখানে শীতের কনকনে হাওয়া সেখানে মালেয়শিয়ার আবহাওয়া উষ্ণ। ৮ জানুয়ারি প্রথমে যাই করহম চধষধপব সোনালী রাজ প্রাসাদ টি ঘুরে আমরা রওয়ানা দেই চবঃৎড়হধং ঞরিহ ঞড়বিৎ এর উদ্দেশ্যে। উচ্চতার দিক থেকে বর্তমানে ১৬ নম্বরে রয়েছে মালয়েশিয়ার ‘পেট্রোনাস টাওয়ার’। পেট্রোনাস টাওয়ার’ হচ্ছে মালয়েশিয়ার সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত।

দেশদর্পণ/এফএফ/এসজে