চুয়াডাঙ্গায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে অটিস্টিক স্কুল

চুয়াডাঙ্গায় ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র গড়ে উঠছে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক স্কুল। সামাজিক দায়বদ্ধতা আর মানবিক মূল্যবোধের কথা বলে স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠা করা হলেও নেপথ্যে ব্যাপক অর্থবাণিজ্য হচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। তাই এগুলো লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই গড়ে তুলছে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তিরা। প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে সরকারের স্বীকৃতি পেলেই মিলবে অনুদান, চাকরি দেয়ার সুযোগ এবং নিজেদের বেতন-ভাতাও। তাই রাতারাতি একের পর এক গড়ে উঠছে স্কুল। নির্মাণাধীন বসতবাড়ি, বাড়ির আঙিনা, ভাড়া বাড়ি এবং কোথাও কোথাও নতুন ঘর তৈরি করে টানানো হয়েছে বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগও চলছে জোরেসোরে। আছে শিক্ষার্থীদের তালিকা। তবে বাস্তবে নেই শিক্ষা কার্যক্রম। বিষয়টি এখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খতিয়ে না দেখলে অনেকেই প্রতারিত হবে বলে সচেতনমহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে স্কুল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রতিদিনই বাড়ছে প্রতিবন্ধীর নামের তালিকা।

সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে তোলা হচ্ছে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক স্কুল। আবার কোনো কোনো স্কুল বেকডেট দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এ স্কুলগুলোতে ম্যানেজিং কমিটি তৈরি করে মাধ্যমিক স্কুলের প্যাটার্নে ১০/১৫ জন করে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। আবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কেউ কেউ গিয়ে স্কুল উদ্বোধনও করে আসছেন। নিয়োগ প্রাপ্তদের কাছ থেকে ডোনেশন হিসেবে নেয়া হচ্ছে মোটাঅঙ্কের অর্থ। স্কুলগুলোতে খাতা কলমে দেখানো হচ্ছে শিক্ষার্থী। ৫জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষা বরাদ্দ। একটি স্কুল খুলতে ন্যূনতম শিক্ষার্থী লাগছে ৭৫জন। সে হিসেবে শিক্ষক সংখ্যা ১৫ জন। এছাড়াও রয়েছে অফিস সহকারী, ক¤িপউটার, আয়া, নৈশপ্রহরী, দফতরি ও গাড়ি চালক।

জেলায় বিশেষ শিশুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এ সুবাদে জেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে এক বা একাধিক স্কুল। বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে প্রতিবন্ধী স্কুল। জেলা পরিসংখ্যান অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ১১ লাখ ২৯ হাজার ১৫ জন। জেলা নির্বাচন অফিসসূত্রে জানা গেছে, জেলার ৪০টি ইউনিয়নে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৫২ হাজার ৬ জন। আর জেলা সমাজসেবাসূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত জেলায় বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২০ হাজার ৬৯৯ জন। সেই সাথে প্রতিদিনই এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন। এদিকে গড়ে ওঠা এ স্কুলগুলো কতোটা মানস¤পন্ন কিংবা সরকারের অনুমোদন আছে কি না, তা অনেক ক্ষেত্রে জানা সম্ভব হয় না। ভুক্তভোগী মা-বাবা প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে এসব স্কুলে তাদের সন্তানকে ভর্তি করান এবং তাদের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী শিশুকে দেখভাল করেন। তবে এসব অনেক স্কুলের যে সরকারি কোনো অনুমোদন নেই, তা স্পষ্ট। বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে, এটি একটি আশার কথা। প্রতিবন্ধী স্কুল পরিচালনায় বিশদ নীতিমালা হয়েছে, আর সংশি¬ষ্ট সবার মতামত নিয়ে নীতিমালাটি এরই মধ্যে চূড়ান্ত করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, যা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়েছে। আর অমনিই হুলুস্থ’ল পড়ে গেছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিবন্ধী স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এখন অটিজম, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন্স সিনড্রোম ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশু এবং ব্যক্তিসহ প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারার বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযোগী করে গড়ে তুলতে জেলায় জেলায় সরকারি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
আরও পড়ুন: লটারিতে ধান ক্রয়, তালিকায় ইউপি চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিবারের নাম

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে একটি বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা থাকলেও প্রতিবন্ধী শিক্ষা পরিচালনা, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি, শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য কোনো নীতিমালা নেই। ফলে নতুন করে একটি নীতিমালা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ছাড়াও ভবিষ্যতে যেসব প্রতিবন্ধী স্কুল, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, প্রতিবন্ধী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আবেদন করবে তাদের শিক্ষাক্রম কী হবে, তা এখনই নির্ধারণ করা হয়েছে।

সূত্রমতে, দেশে ৬২টি প্রতিবন্ধী স্কুল রয়েছে, যেগুলো সুইডেন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হয়ে আসছে। নীতিমালা প্রকাশের পর প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। স্বভাবতই সম্প্রতি লক্ষ্য করা গেছে, এ ধরনের স্কুলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে এবং নিবন্ধন ও এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন জমা পড়েছে। এ সুযোগে একটি সুবিধাবাদি গোষ্ঠী নিছক ব্যবসায়ীক মনোবৃত্তিতে এ ধরনের স্কুল গড়ে তোলার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। দেশে এখন পর্যন্ত ১২ ধরনের প্রতিবন্ধী রয়েছে বলে জানা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে সমসুবিধা পাওয়া ও অধিকার প্রদান একটি সাংবিধানিক অধিকার। এরই মধ্যে প্রণীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩, নিউরো ডেভেলপমেন্ট প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩-এর অধীনে দুটি বিধিমালাও হয়েছে। সর্বশেষ প্রতিবন্ধী স্কুলের জন্য ২০১৯ নীতি মালা তৈরি হয়েছে। নীতিমালায় যেখানে সেখানে মানহীন স্কুল প্রতিষ্ঠা রোধ করার জন্যই এই নীতিমালা তৈরি করছে সরকার। প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দেখবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। আর কারিকুলাম প্রণয়ন ও তা পরিচালনার বিষয়গুলো দেখবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি থাকবে। জেলায় ডিসির নেতৃত্বে ১৩ জন, উপজেলায় ইউএনওর নেতৃত্বে ১৩ জন স্কুল পরিচালনা কমিটি চালাবেন। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ৭৫ জন শিক্ষার্থী থাকতে হবে, তবেই অনুমোদন পাওয়া যাবে। যেহেতু এটি বিশেষায়িত স্কুল তাই প্রতি পাঁচ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রাখতে হবে। পর্যায়ক্রমে মাস্টার্স পর্যন্ত এধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হবে। শর্তপূরণ করে এসব প্রতিষ্ঠান এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) পাবে।
আরও পড়ুন:জীবননগরে সরকারি বই বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
নীতিমালার মধ্যে শিক্ষক নিয়োগের জন্যও আলাদা অধ্যায় আছে। যেখানে যোগ্য শিক্ষক এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিশুরা দেশের যোগ্যতম নাগরিক হয়ে উঠবে। অথচ ব্যাঙের ছাতার মতো স্কুল গড়ে উঠলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে কতোগুলো স্কুল গড়ে উঠেছে তার কোন হিসাব নেই তাদের কাছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক কারণে স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যিক। প্রশ্ন উঠেছে জেলাতে কতোটি স্কুল অনুমোদন পাবে? যদি হাতে গোনা কয়েকটি স্কুল অনুমোদন পায় তাহলে বাকিগুলোর কি হবে? আর যারা ডোনেশনের নামে অর্থলগ্নি করছেন তাদের ভাগ্যেই বা কি জুটবে? পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউপি চেয়ারম্যান জাকারিয়া আলম বলেন, যারা এ সমস্থ স্কুল গড়ে তুলছে তাদের কাছে সরকারি অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চেয়েছিলাম কেউ দেখাতে পারেনি।

বিষয়টি আমি দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট দফতরকে অবহিত করেছি। সেই সাথে যারা নিয়োগ নিচ্ছেন তাদেরকেও সতর্ক করেছি যাতে করে কেউ যেন প্রতারিত না হয়। শুধু প্রতারিতই না এতে করে সরকারেও ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে বলে আমি মনে করছি। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ সাদিকুর রহমান বলেন, স্কুল গড়ে ওঠার বিষয়টি কানে এসেছে। গড়ে ওঠা স্কুলগুলোর বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার নাথ বলেন, কতোগুলো স্কুল গড়ে উঠেছে সেটা বলতে পারবো না। তবে আমাদের কাছে মোট ১৪টি স্কুলের তথ্য লিপিবদ্ধ আছে।

এরমধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ৫টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৪টি, দামুড়হুদা উপজেলায় ৪টি ও জীবননগর উপজেলার ১টি। অর্থ বাণিজ্যের ব্যাপারে তিনি বলেন, লেনদেনের কথা আমাদের কানেও আসছে। তবে কেউ শিকার করছে না। স্কুল যখন অনুমোদন না পাবে তখন কে কতো টাকা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তখন জানা যাবে। তবে আমি সকলের উদ্দেশ্যে বলতে চাই স্কুলের নিয়োগ পারপাসে কেউ যেন অর্থলগ্নি না করেন। নামে বেনামে গড়ে ওঠা প্রতিবন্ধী স্কুলগুলোর বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়ার জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন সচেতনমহল।

দেশদর্পণ/টিআর/এসজে