রাজশাহীর নব্য কোটিপতিরা আতঙ্কে, চেম্বারে বসছেন না অনেকেই

রাজধানি ঢাকায় অবৈধ সম্পদের মালিকদের বিরুদ্ধে চলছে অভিযানে। তবে এর প্রভাব পড়ছে রাজশাহীতেও। চলমান অভিযানে রাজশাহীর টেন্ডারবাজ ও অবৈধভাবে পুকুর ভরাট অবৈধভাবে তালাইমারী বালু মহল দখল করে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া নেতাদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজশাহীতে সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেটের হোতা আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের বেশ নেতাদের প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ ইতোমধ্যেই চিকিৎসা ভিসা নিয়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। আবার অনেকেই রাজশাহী থেকে ঢাকায় গিয়ে অবস্থান করছেন।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার, মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা এসব নেতা ১০ বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। নগরে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন, বাড়ি ও বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রত্যেকের রয়েছে সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত চেম্বার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীতে টেন্ডারবাজির বড় ক্ষেত্র পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের সদর দফতর ও বিএমডিএ। এ দুই সরকারী প্রতিষ্ঠানে বছরে শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকান্ডের টেন্ডার হয়। বিএমডিএর কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দুদকের অভিযানে ৭ কোটি টাকার দুর্নীতিও মিলেছে এ প্রতিষ্ঠানে। স্ট্যান্ড রিলিজ হয়েছিলেন গোটা দশেক কর্মকর্তা।

ত্রিমুখী এই সিন্ডিকেট টেন্ডারগুলো ভাগবাটোয়ারা করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। এসব নেতারা ১০ বছরে নগরে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন স্থানে কিনেছেন বিপুল পরিমাণ জমি ও বাড়ি। এদের অনেকেই ইতোমধ্যেই চিকিৎসা ভিসা নিয়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছেন।

এদিকে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিভিল সার্জন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আওয়ামীলীগ ও যুবলীগের একটি সিন্ডিকেট। এছাড়াও রাজশাহী এলজিইডি, গণপূর্ত ও সড়ক-জনপদ বিভাগের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে নগরীর পশ্চিমাঞ্চলের আওয়ামীলীগ ও যুবলীগের পৃথক তিনটি গ্রুপ।

রাজশাহীতে বালু মহল নিয়ন্ত্রণ করে আসছে মহানগর আ’লীগের প্রভাবশালী এক নেতা। আ’লীগ ক্ষমতার আসার পর বালু মহল একক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। কোটি কোটি টাকার বালু মহল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে টেন্ডার দখল করে অন্য ঠিকাদারদের টেন্ডার ট্রপ করতে না দিয়ে নিজের মনগড়া মূল্যে বালু মহল দখল করে কয়েক বছরে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় শত কোটি টাকা। নগরীতে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন। একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রেলের জমিতে নির্মান করেছেন বিলাস বহুল চেম্বার। বর্তমানে এ প্রভাবশালী নেতা মহামান্য হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নগরীর তালাইমারী বালু ঘাটে সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। প্রত্যেকদিন হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামীলীগের সহযোগি সংগঠনের নেতাদের অনৈতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে ঢাকায় অভিযান শুরুর পর রাজশাহীতে পুকুর খাদক, বালু খাদক আর টেন্ডার খাদকদের দেখা যাচ্ছে না। এছাড়াও তারা আর চেম্বারে বসছেন না।

আরও পড়ুন:
কর্মরত ওয়ার্ড বয়দের বিরুদ্ধে রোগীদের হয়রানির অভিযোগ
মাদক দিয়ে ফাঁসাতে গিয়ে পুলিশের সোর্স নিজেই পুলিশের খাঁচায়

অপরদিকে, রুয়েট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফিউল ইসলাম লেনিন হত্যা মামলার আসামি বহুল আলোচিত এক যুবদল নেতা। সাবেক ছাত্রদল থেকে ছাত্রলীগ হয়ে বর্তমান মতিহার থানা আওয়ামী লীগের এক নেতার গ্রুপের সঙ্গে যোগসাজশে তারা এসব টেন্ডার ভাগবাটোয়ারা করে থাকেন। মোহাইমিনুল ইসলাম মানিক ছাত্রদলের নেতা ছিলেন রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইন্সটিটিউট শাখার। বিএনপিকর্মীর বাবা মনোয়ার ছিলেন ভ্যানচালক। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দলবদল করে ফেলেন মানিকও। বর্তমানে তিনি মতিহার থানা আওয়ামীলীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক।

মানিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ভেয়ার পদে চাকরি করেন। তবে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) বড় বড় কাজের ঠিকাদারি করেন বেনামে। এখন সেই মানিকই বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। নির্মাণ করেছেন আলিশান বাড়িও। রাজশাহীতে তিনি টেন্ডার মানিক নামেই পরিচিত। কিছুদিন পরপরই দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ান। থাকেন পাঁচ তারকা হোটেল রিসোর্টে।

রুয়েটের প্রকৌশল শাখার একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে টেন্ডার মানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নিজেই রুয়েটের প্রায় ৭২ লাখ টাকার ছয়টি কাজ করছেন। টেন্ডার ছাড়াই কোটেশনের মাধ্যমে এ কাজগুলো হাতিয়েছেন টেন্ডার মানিক। এভাবেই বেশ কয়েক বছর ধরেই তিনি কাজ বাগিয়ে নিয়ে কোটিপতি হয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার দলেরই এক নেতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রুয়েটের এক ঠিকাদার জানান, টেন্ডার মানিকের পার্টনার রয়েছেন রুয়েটের দুই কর্মকর্তা। এরা হলেন, রুয়েটের গবেষণা ও সমপ্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক ও অফিসার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুফতি মোঃ রনি এবং রুয়েটের সহকারী প্রকৌশলী, রুয়েট অফিসার্স সমিতির যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও রুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক আহ্ববায়ক হারুন-অর-রশিদ।

রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে রুয়েটের বর্তমান প্রশাসনকে অনেকটা জিম্মি করেই রুয়েটের এই দুই কর্মকর্তা টেন্ডার আহ্ববান ছাড়াই সরকারি নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে টেন্ডার মানিকের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার কাজ করছেন বলেও অভিযোগ।

এ দিকে সম্প্রতি রুয়েটের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণের জন্য ৩৪০ কোটি ১৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প একনেক অনুমোদন পেয়েছে। একনেক সভায় ‘রুয়েট অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের এই উন্নয়ন প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়। রুয়েটের এই ব্যাপক উন্নয়ন কাজ সরকারি নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে হাতিয়ে নিতে বিভিন্নভাবে তৎপরতায় রয়েছেন টেন্ডার মানিকের নেতৃত্বে এই প্রভাবশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট।

অক্টোবর ০৬, ২০১৯ at ২১:৪০:৩০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আহা/আক/এমআর/কেএ