শুভ জন্মদিন: রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা

শেখ হাসিনা গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতিতে বিশ্বাসী এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন তাঁর জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে তাঁর রাষ্ট্রদর্শনের বর্ণাঢ্যময়তাই শেখ হাসিনাকে বিশ্বের অনন্য নেতায় উত্তীর্ণ করেছে। তাঁর জীবন আরো ইতিবাচক বর্ণাঢ্য হয়ে উঠুক ৭৩তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের প্রাক্কালে এই আশাবাদ ব্যক্ত করি।

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৩তম জন্মদিন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা। ১৯৪৭ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করা জননেত্রী আজ ৭৩তম বর্ষে পদার্পণ করলেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকা বহন করে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বৈশ্বিক মানবিক দর্শন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের কল্যাণকর দিকনির্দেশনার জন্য আজ তিনি অনন্য নেতায় পরিণত। শুভ জন্মদিন হে মহান নেতা শেখ হাসিনা।

জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান সময়টা জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের অনুকূল হলেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর এমনটি ছিল না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় বিদেশে অবস্থানের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর মানসিক বিপর্যস্ততার সমতুল্য আর কিছু কি ছিল? ছিল না। আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে শেষ দেখাটুকু পর্যন্ত করতে পারেননি তিনি। এমন মানবীয় বেদনা বোধ আমাদের ক’জনের আছে? যে অনিশ্চিত জীবনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়েছিল তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। নিজের দেশেও ফিরতে পারেননি; স্বজন-বান্ধবহীন শেখ হাসিনা আশ্রয় পেয়েছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। ভারতে আশ্রিত থাকাকালীনই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রত্যয়ে জীবন বাজি রেখেই তিনি দেশে ফিরেন ১৯৮১ সালে। তারপর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত হন এবং শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়েন। তাঁর নেতৃত্ব, জনপ্রিয়তা আর দূরদর্শিতার জন্য তাঁকে বারবার গৃহবন্দি করে তৎকালীন স্বৈরশাসক। এ দেশের ভাগ্যাহত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যে রাজনীতি তিনি শুরু করেছিলেন সেজন্য তাঁকে কী পরিমাণ দুর্ভোগ সইতে হয়েছিল তার হিসাব রাখাও দুষ্কর। নেতা হিসেবে এ দেশের মানুষের মন জয় করে, তাদের মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা লাভ করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যেই শাসকশ্রেণি এ দেশের ইতিহাস এবং সংবিধানকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। জননেত্রী ক্ষমতা লাভের পরপরই ইতিহাস পুনরুদ্ধারের ‘প্রকল্প’ গ্রহণ করেন। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করেন। তাঁর শাসনামলে আর্থসামাজিক খাতে দেশ অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর মধ্যে ভারতের সঙ্গে সঙ্গে ৩০ বছরমেয়াদি গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এ ছাড়া তিনি কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং ভূমিহীন, দুস্থ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি প্রবর্তন করেন। এসবের মধ্যে দুস্থ মহিলা ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্কদের জন্য শান্তি নিবাস, আশ্রয়হীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। এগুলো ছিল দেশকে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রাথমিক প্রয়াস। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি ও কৌশলের কাছে হেরে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট। এ পর্বে পূর্বের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কুখ্যাতদের মন্ত্রিত্ব দিয়ে তাদের গাড়িতে-বাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়া হয়। হাওয়া ভবনকে সমান্তরাল এক প্রশাসন বানিয়ে দেশব্যাপী শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। অতঃপর এরই হাত ধরে আসে ১/১১। পরের ইতিহাস শেখ হাসিনার হাত ধরে সত্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়লাভ করে। সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে জানুয়ারি ৬, ২০০৯-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের ভিত্তি ছিল একটি যুগোপযোগী ম্যানিফেস্টো- যাকে শেখ হাসিনা আখ্যা দিয়েছিলেন ‘রূপকল্প-২০২১’। এতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর অর্থাৎ ২০২১ সাল নাগাদ দেশের বিভিন্ন খাতে অগ্রগতির লক্ষ্যমাত্রা নির্দেশিত ছিল। এ সময়ে শেখ হাসিনা সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩,২৬০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, গড়ে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন, ৫ কোটি মানুষকে মধ্যবিত্তে উন্নীতকরণ, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড এবং ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, বিনা জামানতে বর্গাচাষিদের ঋণ প্রদান, চিকিৎসাসেবার জন্য সারাদেশে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, ২০০৬ সালের ৩৮.৪ দারিদ্র্যের হার থেকে ২০১৩-১৪ বছরে ২৪.৩ শতাংশে হ্রাস প্রভৃতি। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা তাঁর নেতৃত্বকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

শান্তি প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন ডিগ্রি এবং পুরস্কার প্রদান করে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ক্ষুধার বিরুদ্ধে আন্দোলনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শেখ হাসিনাকে সম্মানজনক ‘সেরেস’ মেডেল প্রদান করে। সর্বভারতীয় শান্তিসংঘ শেখ হাসিনাকে ১৯৯৮ সালে ‘মাদার তেরেসা’ পদক প্রদান করে। পশ্চিমবঙ্গ সর্বভারতীয় কংগ্রেস ১৯৯৭ সালে তাঁকে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু স্মৃতিপদক প্রদান করে। ২০১৪ সালে ইউনেসকো তাঁকে ‘শান্তির বৃক্ষ’ এবং ২০১৫ সালে উইমেন ইন পার্লামেন্টস গ্লোবাল ফোরাম নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তাঁকে রিজিওনাল লিডারশিপ পুরস্কার এবং গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভেলপমেন্ট এক্সপো-২০১৪ ভিশনারি পুরস্কারে ভূষিত করে। জাতিসংঘ পরিবেশ উন্নয়ন কর্মসূচি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশ এবং টেকসই উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে শেখ হাসিনাকে তাদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ-২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এ ছাড়া টেকসই ডিজিটাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য International Telecommunication Union (ITU) শেখ হাসিনাকে ICTs in Sustainable Development Award-2015 প্রদান করে। সর্বশেষ তাঁর ৭৩তম জন্মদিনের প্রাক্কালে জাতিসংঘ অধিবেশনে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কার লাভ করেন।

শেখ হাসিনা বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফরেইন পলিসি নামক সাময়িকীর করা বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ১০০ বৈশ্বিক চিন্তাবিদদের তালিকায় শেখ হাসিনা জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি বিশ্ব নারী নেত্রী পরিষদের একজন সদস্য, যা বর্তমান ও প্রাক্তন নারী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। আবার বিশ্বের যে ক’জন নেতা সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে আছেন তার মধ্যেও শেখ হাসিনার নাম প্রথম সারিতে। ২০১৮ সালে পিপলু খানের পরিচালনায় ‘হাসিনা : এ ডটারস টেল’ নামক তথ্যচিত্রে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। তাঁর জীবন, রাষ্ট্রদর্শন ও রাজনীতি নিয়ে রচিত হয়েছে জনপ্রিয় ও গবেষণাধর্মী বহু পুস্তক।

শেখ হাসিনা গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও অগ্রগতিতে বিশ্বাসী এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন তাঁর জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে তাঁর রাষ্ট্রদর্শনের বর্ণাঢ্যময়তাই শেখ হাসিনাকে বিশ্বের অনন্য নেতায় উত্তীর্ণ করেছে। তাঁর জীবন আরো ইতিবাচক বর্ণাঢ্য হয়ে উঠুক ৭৩তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের প্রাক্কালে এই আশাবাদ ব্যক্ত করি।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।