অস্ত্রসহ আটক, কমিটিতে নেই তবুও যুবলীগ নেতা!

কলেজের দোড়গোড়ায় পৌঁছাননি অথচ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, কমিটিতে নেই অথচ যুবলীগ নেতা। আবার তারই একভাই জামায়াতের রোকন, আরেক ভাই যুবদল নেতা।

নগরীর চকবাজারসহ আশপাশের এলাকার আতঙ্ক যুবলীগ নেতা পরিচয় দানকারী নূর মোস্তফা ওরফে টিনু চাঁদাবাজি, ছিনতাই, দখলবাজিসহ নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্য কর্মকাণ্ডে জড়িত। ঢাল হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছেন সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিকে।

এ ছাড়াও নগর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতাও তাকে প্রকারান্তরে সমর্থন দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অবশেষে সেই সন্ত্রাসী টিনুকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

টিনুকে নিয়ে রাতভর অভিযান শেষে তার হেফাজতে থাকা বিদেশি পিস্তল, শর্টগান, ম্যাগজিন ও ৭২ রাউন্ড গুলিসহ তার সহযোগী জসিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তবে মহানগর যুবলীগের কোনো নেতাই টিনু’কে তাদের সদস্য হিসেবে মানতে নারাজ।

পুলিশ, র‌্যাব ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে টিনু কয়েক দফায় কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন।

চকবাজার এবং এর আশপাশের বিভিন্ন মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস ও টেম্পুসহ নানা খাত থেকে টিনু’র নেতৃত্বে তার বাহিনী চাঁদাবাজি করত ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাত। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ভয়ভীতি দেখানো, ছিনতাই-চাঁদাবাজি ও কিশোর অপরাধী চক্র গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে টিনুর বিরুদ্ধে।

টিনুর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতারাও রীতিমত বিব্রত। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকার পরও ক্ষমতাসীন দলের সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি’র অনুসারী হওয়ায় সবকিছু জেনেও প্রশাসন রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দেশব্যাপী জুয়া-মাদক ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলাকালে অবশেষে টিনু নামে দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রসীকে গ্রেপ্তার করা হলো।

আরও পড়ুন:
এমপি নুসরাত ও মিমির নাচের ভিডিও ভাইরাল (ভিডিও)
ক্যাসিনো আতঙ্কে তরকা মডেল-অভিনেত্রীরাও!

চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে নূর মোস্তফা টিনু হচ্ছেন দ্বিতীয়, টিনুর বড় ভাই মোহাম্মদ সেলিম জামায়াতের রোকন পর্যায়ের একজন নেতা। আর ছোট ভাই নুরুল আলম শিপু চকবাজার থানা ছাত্রদলের সভাপতি।

ফলে সরকারে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ যারাই ক্ষমতাই আসুক, তিনি সবসময় নিরাপদ। ছাত্রশিবিরের নেতা তার আপন ভাই নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হলে, তাকে ছাড়াতে পাঁচলাইশ থানা ঘেরাও করেও আলোচনায় এসেছিলেন টিনু।

টিনুর বিরুদ্ধে নগরীর পাঁচলাইশ ও চকবাজার এলাকায় জমি দখল, ছিনতাই ও নিয়মিত চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। যুবলীগ নেতা দাবি করলেও টিনুকে সাংগঠনিক কোনো কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত দেখা যায়নি।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, গত ২২ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে টিনুকে নগরীর চকবাজার থানার কাপাসগোলা এলাকা থেকে আটক করা হয়। এরপর ওই এলাকায় তার বাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘিরে তল্লাশি চালায় র‌্যাব।

গ্রেপ্তারের সময় টিনুর কাছ থেকে একটা পিস্তল, ৫ রাউন্ড গুলি ও একটি ম্যাগজিন পাওয়া যায়। এরপর নগরের কাপাসগোলা এলাকায় টিনুর বাসায় অভিযানে যায় র‌্যাব। সেখানে রাতভর তল্লাশি চালানো হয়।

এ সময় বিদেশি শর্টগান ও ৬৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধারের পাশাপাশি টিনুর সহযোগী জসিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‌্যাব-৭ সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মাশকুর রহমান বলেন, টিনু ও তার সহযোগীর কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি শর্টগান ও ৭২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে। থানায় হস্তান্তর করার পর তাদের পুলিশ আদালতে হাজির করে। পাঁচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভূঁইয়া ভোরের কাগজকে বলেন, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গতকাল সোমবার বিকেলে টিনুসহ ২ জনকে থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় মামলা দায়ের করার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হবে।

এ ব্যাপারে মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু ভোরের কাগজকে বলেন, ‘টিনু যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়, যুবলীগের ১০১ জনের কমিটির কোনো পদেও নেই তিনি।

আমাদের অনুমোদিত ওয়ার্ড পর্যায়ের কোনো কমিটিতেও তিনি নেই। এখন কেউ যদি দলীয় কোনো পদে না থেকে নিজেকে যুবলীগ নেতা দাবি করে কোনো স্বার্থ হাসিল বা কোনো অবৈধ কার্যকলাপে লিপ্ত হন তা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।

যুবলীগের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কাজ করেন, তবে তার দায় আমরা নেব না। এ অবস্থায় তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই ব্যবস্থা নিতে পারে।’

জানা গেছে, সাতকানিয়ার কেরানীহাটের টিনুর পরিবার ২৫ বছর আগে নগরীর কাপাসগোলা এলাকার সাত মৌলানা মাজারের পাশে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন।

টিনু বিবিরহাট এলাকায় রহমানিয়া স্কুল থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটান। পরে সেখানে একটি দোকানে চাকরি নেন। পরে তিনি বহদ্দারহাটে কাঁচাবাজারে ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

১৯৯৭ সাল নাগাদ আশপাশ এলাকার উঠতি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। এভাবে তার অপরাধের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হতে থাকে এবং অপরাধের ধরন ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বাড়তে থাকে।

বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন ভবন ছাড়াও বিভিন্ন জায়গা থেকে মোটা অংকের চাঁদা সংগ্রহ শুরু করে অপরাধ জগতে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি।

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৯ at ০০:৪০:২৯ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আহা/আক/ভোকা/এএএম