ঢাকার ক্যাসিনোতে ওড়ে টাকার বান্ডিল

ইয়ংমেনস ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে র‌্যাব হানা দেয়ার পর ঢাকার ক্যাসিনো নিয়ে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঢাকায় অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার নেপথ্যে রয়েছেন যুবলীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা।

মাথার ওপরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী, এমপির আশীর্বাদ থাকায় তারা এতটাই ক্ষমতাধর যে তাদের ব্যাপারে অভিযোগ করার সাহস পেতেন না কেউ।

পুলিশের নাকের ডগায় যুগ যুগ ধরে এসব চললেও বাদ সাধেনি কেউ। বরং ক্যাসিনো ও জুয়ার টাকার ভাগ গেছে অনেকের পকেটে।

ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট। ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এক সম্রাটের অধীনে রয়েছে ১৫টিরও বেশি ক্যাসিনো। এসব ক্যাসিনো থেকে প্রতি রাতে তার পকেটে ঢোকে ৪০ লাখের বেশি টাকা!

যুবলীগ নেতা সম্রাটের তত্ত্বাবধানে নেপালি নাগরিক দীনেশ ও রাজকুমার ঢাকায় একের পর এক ক্যাসিনো খুলে বসে। এ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে নেপালে।

মতিঝিল-বনানী থেকে শুরু করে উত্তরা পর্যন্ত অন্তত ১৫টি ক্যাসিনো চলে সম্রাটের অধীনে। এগুলোর কোনোটি থেকে প্রতি রাতে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা জমা হয় সম্রাটের নামে।

ভিক্টোরিয়া ক্লাব :
ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ২০১৫ সালে ক্যাসিনো খোলার মাধ্যমে বাংলাদেশে অবৈধ এ ব্যবসা শুরু করেন নেপালের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী দীনেশ ও রাজকুমার। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বিনোদ মানালী।

ভিক্টোরিয়ায় ক্যাসিনো চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই বাবা নামের এক নেপালি নাগরিকের কাছে ক্যাসিনোটি বিক্রি করে দেন তারা। তখন থেকে বাবা ও তার ম্যানেজার হেমন্ত মিলে ক্যাসিনোটি চালাতে থাকেন।

ভিক্টোরিয়া ক্লাবের সভাপতি কাজল ও সাধারণ সম্পাদক তুহিন। প্রতিদিন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ভাড়া নেন তারা। আর সম্রাটের চাঁদা দিনে ৪ লাখ টাকা। তার সহযোগী যুবলীগ নেতা আরমান ও খোরশেদ প্রতিদিন গিয়ে চাঁদার টাকা নিয়ে আসতেন।

কলাবাগান ক্লাব :
ঢাকার নামকরা জুয়াড়ি সেন্টু ২০১৬ সালে কলাবাগান ক্লাবে ক্যাসিনো খোলেন নেপালি নাগরিক দীনেশ, রাজকুমার ও অজয় পাকরালের সঙ্গে অংশীদারিত্বে। এখান থেকে প্রতিদিন ২ লাখ টাকা করে চাঁদা নিতেন সম্রাট। চাঁদা তুলতেন আরমান।

অভিযোগ আছে, চাঁদার অঙ্কে বনিবনা না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ওই ক্লাব বন্ধ করে দেন সম্রাট। অনেক দেনদরবার করেও আর ক্যাসিনোটি চালু করতে পারেননি সেন্টু।

আরও পড়ুন:
ধর্ষিতার বাবার কাছে ঘুষ দাবি তদন্ত কর্মকর্তার!
লেকের পানিতে ভেসে উঠল অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ

সৈনিক ক্লাব :
মালিবাগ-মৌচাক প্রধান সড়কের পাশের একটি ভবনে অবস্থান সৈনিক ক্লাবের। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের নামে এই ক্লাব চলে। আর এটি নির্ধারিত টাকায় ভাড়া নিয়ে ক্যাসিনো খোলেন যুবলীগ নেতা জসিম উদ্দিন ও এ টি এম গোলাম কিবরিয়া। তাদের অংশীদার নেপালি নাগরিক প্রদীপ। এই ক্লাব থেকে প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা চাঁদা পান সম্রাট।

ঢাকা গোল্ডেন ক্লাব :
বনানী আহমেদ টাওয়ারের ২২ তলায় ঢাকা গোল্ডেন ক্লাব চালু করেন চাঁদপুরের ব্যবসায়ী আওয়াল পাটোয়ারি ও আবুল কাশেম। ক্লাবটি চালুর কিছু দিনের মধ্যেই কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর বাড়ে সম্রাটের মাসোহারার অঙ্ক। আর তোলাবাজ আরমান জোর করে ক্লাবটির মালিকানায় ঢুকে যায়। নেপালি নাগরিক অজয় পাকরালের তত্ত্বাবধানে চলত ক্যাসিনোটি। এখান থেকেও সম্রাটের জন্য প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন আরমান।

ওয়ান্ডারার্স ক্লাব :
এই ক্লাবে ক্যাসিনো খোলেন নেপালি নাগরিক হিলমি। তার অংশীদার মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মোবাশ্বের। সম্রাটের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলে এই ক্যাসিনোটি। এখান থেকে প্রতিদিন সম্রাটের চাঁদা ৫ লাখ টাকা। আরমান, খোরশেদ ও জাকির এই ক্যাসিনো থেকে চাঁদার টাকা নিয়ে যান।

দিলকুশা ক্লাব :
এই ক্লাবের মালিক নেপালি নাগরিক দীনেশ, রাজকুমার ও ছোট রাজকুমার। ভারতীয় আরো দুজন অংশীদার থাকলেও তাদের নাম জানা যায়নি। এই ক্যাসিনো থেকে সম্রাটের প্রতিদিনের চাঁদা ৪ লাখ টাকা। এর বাইরে আরমানের নিজের চাঁদা ১ লাখ।

আরামবাগ ক্লাব :
এক সময়ের ফুটপাতের হকার, বর্তমানে মতিঝিল থানা যুবলীগ নেতা জামালের মালিকানায় ক্যাসিনো খোলা হয় আরামবাগ ক্লাবে। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ তার অলিখিত অংশীদার। আছে নেপালি অংশীদারও। এই ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন সম্রাটের চাঁদা ৩ লাখ টাকা।

ফুয়াং ক্লাব :
তেজগাঁও লিংক রোডের ফুয়াং ক্লাবে একসময় মদ বিক্রির পাশাপাশি নিয়মিত বসত ডিজে গানের আসর। ক্লাব মালিক নূরুল ইসলামের সঙ্গে তেজগাঁও জোনের এক পুলিশ কর্মকর্তার ‘ঝামেলা’র কারণে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় ডিজে আয়োজন।

এরপর ওই কর্মকর্তার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ক্লাবের দোতলার হল রুমে বসানো হয় ক্যাসিনো। ক্লাবটির একক মালিক নূরুল ইসলাম পুরস্কার ঘোষিত এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আত্মীয় হওয়ায় এই ক্লাবে সম্রাটের চাঁদার পরিমাণ কম, দিনে ২ লাখ টাকা।

মোহামেডান ক্লাব :
বনানীর ঢাকা গোল্ডেন ক্লাবের মালিক ব্যবসায়ী আবুল কাশেম ও মতিঝিলের স্থানীয় যুবলীগ নেতা ইমরানের মালিকানায় মোহামেডান ক্লাবে চলছিল ক্যাসিনো। এর নেপালি অংশীদার কৃষ্ণা। এই ক্যাসিনোটিতে এরই মধ্যে অভিযান চালানো হয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন আরমানের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন সম্রাট।

মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব :
সম্রাটের চাচা হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী আলী হোসেন এই ক্লাবে ক্যাসিনো চালু করেন। দীনেশ ও রাজকুমার তার ব্যবসায়িক অংশীদার। আলী হোসেনের নামে ক্যাসিনোটি চললেও এর মূল মালিক সম্রাট নিজেই, যদিও কাগজে-কলমে তার নাম নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিন চাঁদার পরিমাণ ৫ লাখ টাকা।

ইয়ংমেনস ক্লাব :
স্থানীয় সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেননকে চেয়ারম্যান করে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া প্রতিষ্ঠা করেন ইয়ংমেনস ক্লাব। ফুটবল, ক্রিকেটের উন্নয়নের কথা বলে ক্লাবটি প্রতিষ্ঠার পর অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এনে নিজেই চালু করেন ক্যাসিনো। এখান থেকেও দিনে ৪ লাখ টাকা চাঁদা নিতেন সম্রাট।

এজাক্স ক্লাব :
এলিফেন্ট রোডের এজাক্স ক্লাবে ক্যাসিনো চালু হয় যুবলীগ নেতা আরমান, তছলিম ও খোরশেদের তত্ত্বাবধানে। নেপালি নাগরিক ছোট রাজকুমারকে দিয়ে ক্যাসিনোটি চালু করেন তারা। এই ক্যাসিনো থেকে প্রতিদিন সম্রাটের চাঁদা ৩ লাখ টাকা।

উত্তরার ক্যাসিনো :
দীনেশ ও রাজকুমারের অংশীদারিত্বে উত্তরায় এপিবিএন অফিসের উল্টো পাশে একটি ভবন ভাড়া করে চালু করা হয় ক্যাসিনো। তাদের পার্টনার হন তছলিম নামের এক স্থানীয় যুবলীগ নেতা। এরপর ওই এলাকায় সম্রাটের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় যুবলীগ নেতাদের মাধ্যমে আরো কয়েকটি ক্যাসিনো গড়ে তোলা হয়। প্রতিটি ক্যাসিনোতে সম্রাটের চাঁদা দিনে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা।

সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯ at ১২:৪১:৩০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আহা/আক/ভোকা/এএএম