চাঁদা বিতর্কে অস্থির জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী পদচ্যুত হলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উন্নয়ন কাজে প্রায় দেড় কোটি টাকার চাঁদাবাজি নিয়ে বিতর্ক থামছে না।

প্রতিনিয়ত বেরিয়ে আসছে এ সংক্রান্ত নতুন নতুন তথ্য। ফলে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ক্যাম্পাস।

শোভন-রাব্বানীর পর এখন অভিযোগের তীর জাবি উপাচার্য ও তার পরিবারের সদস্যদের দিকে। টাকা ভাগাভাগি নিয়ে রবিবার একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ায় সৃষ্টি হয় নতুন বিতর্ক।

এই প্রেক্ষাপটে জাবি ভিসিকে সরিয়ে দেয়ার দাবি জোরাল হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ও শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে রবিবার।

৬ মিনিটের এই ফোনালাপে উপাচার্যের মাধ্যমে জাবি ছাত্রলীগের টাকা ভাগাভাগির কথা উঠে এসেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, এই ফোনালাপ অসত্য, উদ্দেশ্যমূলক।

উপাচার্যকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে এ গল্প তৈরি হয়েছে। এ ধরনের পরিকল্পিত মিথ্যা গল্পের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ অফিস এবং বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদ বিবৃতি দিয়েছে।

তবে জাবি ছাত্রলীগের একটি পক্ষ ঈদ সালামি হিসেবে টাকা পাওয়ার বিষয়টি ভোরের কাগজকে নিশ্চিত করেছে। তারা বলছে, জাবির উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শাখা ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।

ফোনালাপ থেকে জানা গেছে, জাবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি হামজা রহমান অন্তরের মোবাইলে কল করেন গোলাম রাব্বানী। আলাপের একপর্যায়ে রাব্বানী টাকা ভাগাভাগির বিষয়ে অন্তরের কাছে জানতে চান।

অন্তর টাকা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমাকেও টাকা নিতে বলা হয়েছিল কিন্তু আমি নেইনি। এরপর বিস্তারিত জানার জন্য অন্তর তার ফোনটি পাশে থাকা জাবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনকে ধরিয়ে দেন।

রাব্বানী ও সাদ্দামের ফোনালাপ থেকেই ফাঁস হয় টাকা ভাগাভাগির বিষয়টি। এসময় কথোপকথনে সাদ্দাম বলেন উপাচার্য ম্যামের বাসাতেই আমি (সাদ্দাম), তাজ, জুয়েল (জাবি ছাত্রলীগ সভাপতি) ও চঞ্চল (জাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক) আমরা চারজন ছিলাম।

আরও পড়ুন:
১০ম মৌলভীবাজার রোভার মেটকোর্স ক্যাম্প সফলভাবে সম্পন্ন
চৌগাছায় অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত গরু, দিশেহারা কৃষক

সেখানেই টাকা ভাগাভাগির ডিলিংস হয়। এরপর গাড়িতে করে একজন আমার হলের সামনে এসে আমাকে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে যায়।

এসময় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা কিভাবে ভাগাভাগি হলো সাদ্দামের কাছে তা জানতে চান রাব্বানী। জবাবে সাদ্দাম বলেন, আমি এক কোটির বিষয়ে জানি, ৬০ লাখের বিষয়টি জানি না।

এখন বিষয়টি হচ্ছে তাজরা বামদের (বাম ছাত্রসংগঠন) সঙ্গে সেটিংয়ে গেছে। তারা বিচার বিভাগীয় তদন্ত বাদে বাকি দাবিগুলো বামের কাছে মেনে নিয়েছে। বাকি দাবিগুলোও মেনে নেয়া হবে কি না সেটা নিয়ে আগামী বুধবার বসবে।

তখন রাব্বানী বলেন, ম্যাম নাকি বলেছে যে এই আন্দোলনও নাকি আমরা করিয়েছি?

জবাবে সাদ্দাম বলেন, ভাই বিষয়টি হচ্ছে উনি (ভিসি) আর কি ছাত্রলীগের ওপর দিয়ে সবকিছু করে নিজের ফ্যামেলিকে সেভ করতে চাচ্ছেন। উনি ভাই খুব নোংরামী করছেন। আমাদের কি করতে হবে ভাই, আপনারা জানান।

এ পর্যায়ে রাব্বানী বলেন, তোমাদের কিছুই করতে হবে না। এরপর জানতে চান, ৬টা কাজ কে ডিল করেছে। সাদ্দাম বলেন, তার (ভিসি) ছেলে, পিএস ছানোয়ার ভাই, পিডি আর ম্যামের হাজবেন্ড।

শুরু থেকেই তারা সবকিছু করছে। আর সিডিউল বিক্রির টাইমে ভিসির হাসপাতালে ভর্তি হওয়াটা ছিল নাটক। শিডিউল বিক্রি শেষ, তখন তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কারো কারো সন্দেহ উপাচার্যকে ফাঁসাতেই এই অডিও রেকর্ডটি পরিকল্পিতভাবে বের করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল জাবি ছাত্রলীগের সাদ্দাম-তাজ (বিদ্রোহী) গ্রপের পক্ষ থেকেও টাকা পাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করা হয়।

এ বিষয়ে জাবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি নিয়ামুল হক তাজ বলেন, প্রতিবারের মতো ঈদ সালামি হিসেবে টাকা পেয়েছি, তবে আমরা জানি না টাকাটা কিসের ছিল।

আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আছি। যেই দোষী হোক তার শাস্তি হবে। সেক্ষেত্রে আমরাও যদি দোষী হই তাহলে আমাদের বিরুদ্ধেও সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হোক।

অন্যদিকে উপাচার্যের বিরুদ্ধে গতকাল আবারো আন্দোলনে নেমেছেন বিক্ষোভকারীরা। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির ঘটনায় উপাচার্যের নীরব ভূমিকা এবং আন্দোলনকারীদের ওপর মিথ্যা দোষ চাপানোর ঘটনায় বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা।

বিক্ষোভ মিছিল শেষে আন্দোলনকারীরা বলেন, ছাত্রলীগ আগস্ট মাসে চাঁদা দাবি করলেও উপাচার্য তা প্রকাশ করেননি। উল্টো সাংবাদিকরা জানতে গেলে তাদের হেনস্তা করেন তিনি।

এসময় জাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক শোভন রহমান বলেন, প্রশাসন বলে আমরা নাকি উন্নয়ন কাজে বাধা দেই। তাহলে আমরা বলতে চাই যারা ৪-৬% চায় তারা কি আদৌ উন্নয়নমুখী?

আপনার কাছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ টাকার দাবি করেছে আগস্টে, আপনি এত দিনে কেন সেটা প্রকাশ করেননি।

এখন কেন সেটা প্রকাশ করলেন? আমরা যখন আমাদের ন্যায্য দাবির জন্য আন্দোলন করি তখন আপনি আমাদের নামে মামলা করেন।

কিন্তু আপনাকে তারা টাকার জন্য চাপ দিল অথচ থানায় একটা ডায়েরিও করলেন না। কারণ আপনি নিজেই একজন দুর্নীতিবাজ।

সেপ্টেম্বর  ১৭, ২০১৯ at ১১:১০:৩০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আহা/আক/ভোকা/এএএম