ডিসেম্বরেই উৎপাদনে আসছে পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র

দেশের বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসনে বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম বড় উদ্যোগ পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ নির্মাণ প্রকল্প। চলতি বছরের মাঝামাঝি এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও নানা জটিলতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে আগামী ডিসেম্বর মাসেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে আসবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (পিডিবি) কর্মকর্তারা। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ আমদানিকৃত কয়লা যুগেও প্রবেশ করবে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ খালেদ পায়রা তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প প্রসঙ্গে জানান, কিছু জটিলতার কারণে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।

প্রকল্প এলাকার গ্রামবাসীর সঙ্গে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে কাজ কিছু দিন বন্ধ ছিল। এখন এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে। ফলে কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।

তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করছি এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার অনেকটাই নিরসন হবে।

জানা গেছে, সরকার কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহের বিষয়টি মাথায় রেখেই ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কয়লাভিত্তিক তিনটি বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।

এই তিনটি প্রকল্পের মধ্যে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প অন্যতম। এই প্রকল্পে বিনিয়োগের লক্ষ্যে এগিয়ে আসে চীন। চীনের এক্সিম ব্যাংক অর্থ দিচ্ছে।

বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১৬ হাজার কোটি টাকা।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটির উৎপাদনে আসার কথা ছিল। কিন্তু কাজের ধীরগতির কারণে সময় পিছিয়ে চলতি বছরের প্রথমে এপ্রিল এবং পরে অক্টোবর মাস নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু ২ মাস আগে স্থানীয়দের সঙ্গে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বড় ধরনের ঝামেলার সৃষ্টি হয়। মারামারির পর মামলা পর্যন্ত হয়। বেশ কিছু শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়।

আরও পড়ুন:
বন্দুকযুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ী নিহত
৭জন ওয়ারেন্টের পালাতক আসামী আটক

এই পরিস্থিতির কারণে বেশ কিছু দিন প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকায় এ সময়ের মধ্যেও প্রথম ইউনিটের উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিটের উৎপাদন শুরু হবে। আর দ্বিতীয় ইউনিটের উৎপাদন আগামী বছরের জুন মাসে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।আর যেন কোনো ঝামেলার সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারেও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্পের সব কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এই প্রকল্পের জন্য আগামী ১০ বছর সমুদ্রপথে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আসবে।

জাহাজে আসা কয়লা খালাশ করতে পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে আগুনমুখা নদীর তীরে ৩৮৫ মিটার দৈর্ঘের একটি জেটি নির্মাণকাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে।

এ জেটিতে একসঙ্গে দুটি জাহাজ থেকে কয়লা খালাশ করা সম্ভব হবে। জেটি থেকে প্লান্টে কয়লা পৌঁছাতে শ্রমিকের প্রয়োজন হবে না।

গ্রেডশিপ আন লোডার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। জাহাজ থেকেই কয়লা বেল্টের মাধ্যমে প্লান্টে চলে যাবে। তারপর এই কয়লা পুড়িয়ে তাপ উৎপন্ন করা এবং পানিকে বাষ্পে রূপান্তরিত করা হবে। এরপর এই বাষ্পকে সবেগে টারবাইনে পাঠিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

গত জানুয়ারি মাসে প্রথম ইউনিটের টারবাইন অলটানেটর স্থাপন করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি ৬ হাজার প্রকৌশলী আর শ্রমিক প্রকল্পের কাজ শেষ করতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।

একই সঙ্গে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভির সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সঞ্চালন লাইনের কাজ শুরু হয়ে চলতি বছরের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

সঞ্চালন লাইন এবং সাবস্টেশন নির্মাণকাজ শেষ করতে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশকে (পিজিসিবি) নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের একজন সহকারী প্রকৌশলী জানান, প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের বয়লার ও টারবাইন সফলভাবে স্থাপন কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এখন কমিশনিং কাজ চলছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে। কয়েক মাস আগে প্রকল্পের এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে জটিলতার কারণে কাজের গতি ব্যাহত হয়।

তবে এখন কাজ ভালোভাবেই চলছে। প্রকল্পের জন্য ১ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৪০০ একর জমি ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের আবাসন, অফিসসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি জমিতে আরো ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ে ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে অন্য একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাংলাদেশ এবং চীনের সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) ও চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট এন্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসিএল) যৌথভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক।

এদিকে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়লাভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আমদানিকৃত কয়লার ওপর কর কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

আমদানিকৃত কয়লার দাম অপেক্ষাকৃত কম রাখতে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে একটি চিঠি দিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এই চিঠির পর রাজস্ব বোর্ড কর কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ পায়রা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে।

এই দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও কয়লায় চলবে। প্রতিদিন লাখ লাখ টন কয়লা আসবে। সরকারের মেগা প্রকল্প। তাই রাজস্ব বোর্ড ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সেপ্টেম্বর  ১৪, ২০১৯ at ১২:১৬:৩০ (GMT+06)
দেশদর্পণ/আহা/আক/ভোকা/এএএম