‘মমতাময়ী নেত্রী’ সম্বোধন করে ক্ষমা চেয়ে রাব্বানীর চিঠি, বিমুখ নেতারা

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ হওয়ায় ও গণভবনে প্রবেশের পাস বাতিল করায় আওয়ামী লীগের প্রায় সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

শোভন ও রাব্বানীর ব্যাপারে নানাভাবে চেষ্টা তদবির করেও তাদের ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পাননি ছাত্রলীগের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় চার নেতা। এমনকি ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের ব্যাপারে তদন্তে নেমেছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও।

এমন পরিস্থিতিতে তিনটি ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সভাপতি, ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজ হাতে আবেগঘন চিঠি লিখেছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। চিঠির শুরুতে প্রধানমন্ত্রীকে ‘মমতাময়ী নেত্রী’ সম্বোধন করেছেন।

চিঠিতে অভিযোগ-১ উল্লেখ করে বলা হয়, ‘২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-এর নতুন পার্টি অফিস আপনার আবেগের ঠিকানায় আমাদের ঠাঁই দিয়েছেন। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলছি, আপনার আমানতকে যত্নে রেখেছি।

অফিস অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা করা নিয়ে যে অভিযোগ দেয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দায়িত্বপ্রাপ্ত শাহজাহান ভাই চায় না ছাত্রলীগ এখানে থাকুক। লোক দিয়ে বাইরে থেকে ময়লা ফেলে বাথরুম ও দেয়াল অপরিচ্ছন্ন করে, সেগুলোর ছবি তুলে আপনাকে দেখানো হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মিণ্টু ভাই, লোকমান ভাই এবং ক্লিনার জাবেদ ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন।’

অভিযোগ-২ উল্লেখ করে ২০ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে দেরি করে যাওয়া প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘১৮ জুলাই আপনি দেশের বাইরে যাবার আগে অনুমতি নিয়ে ১৯ তারিখ আম্মুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আমি এবং সভাপতি মাদারীপুর গিয়েছিলাম। এইদিনই সারারাত নির্ঘুম জার্নি আর বেশ কয়েকটি পথসভা (সর্বশেষ সকাল ৮টায় সাভারে) করে সকাল ৯টায় ফিরি। রেস্ট নিয়ে পূর্বনির্ধারিত ১২টার সম্মেলনে পৌঁছাতে আমাদের ৪০ মিনিট দেরি হয়। যা অনিচ্ছাকৃত এবং অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পূর্বেই অবগত। সকালে ঘুম থেকে দেরিতে উঠার বিষয়টিও অতিরঞ্জিত।

অভিযোগ-৩ এর ব্যাখ্যায় রাব্বানী লেখেন, ‘বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপাচার্য ম্যামের স্বামী ও ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে কাজের ডিলিংস করে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য করেছে। যার প্রেক্ষিতে ঈদুল আজহার পূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দিয়েছে। এ খবর জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হয় এবং এরই প্রেক্ষিতে উপাচার্য ম্যাম আমাদের স্মরণ করেন। আমরা দেখা করে আমাদের অজ্ঞাতসারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে টাকা দেয়ার প্রশ্ন তোলায় তিনি বিব্রতবোধ করেন। নেত্রী, উক্ত পরিস্থিতিতে আমরা কিছু কথা বলি যা সমীচীন হয়নি। এজন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী’।

এই তিনটি অভিযোগের ব্যাখ্যার পর ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক লেখেন, ‘সবকিছুর পরেও আমাদের জ্ঞাত-অজ্ঞাত ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি বঙ্গবন্ধু কন্যা, মানবতার মা…। নিজ বদান্যতায় আমাদের ক্ষমা করে ভুলগুলো শুধরে আপনার আস্থার প্রতিদান দেয়ার সুযোগটুকু দিন। আপনি মুখ ফিরিয়ে নিলে যাবার কোনো জায়গা নেই’।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা চিঠিটি শেষ করেন ‘আপনার স্নেহের রাব্বানী’ লিখে। চিঠির শুরুতে আকুতি জানিয়ে বলেন, আপনার সন্তানরা এতটা খারাপ না। আমরা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি বারবার। অনেক অব্যক্ত কথা রয়েছে, যা আপনাকে বলার কখনও সুযোগ পাইনি। বিভিন্ন মাধ্যমে শ্রুত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকৃত সত্যটুকু উপস্থাপনের সুযোগ চাই।

এদিকে, ছাত্রলীগের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের সঙ্গে কয়েক দফা সাক্ষাৎ করেও নিরাশ হয়েছেন শোভন-রাব্বানী। তারা কৌশলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলার সুযোগ খুঁজেও ব্যর্থ হয়েছেন।

অন্যদিকে, শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্পাদক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা শোভন-রাব্বানীকে পাশ কাটিয়ে চলছেন। অবস্থা বেগতিক দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে উঠেছেন রাব্বানী।