মধ্যবিত্ত_সমাচার–

82

লেখক: ডা. মিথিলা ফেরদৌস
বিসিএস স্বাস্থ্য
সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ।

একবার স্টুডেন্ট লাইফে সোফা কিনতে গিয়েছিলাম মিরপুর কাজি পাড়ায়। এগারোটা দোকান ঘোরার পর, বারো নাম্বার দোকান দেখে মাথা নষ্ট এত্ত সুন্দর করে বাইরেই সাজানো, বাইরে ছোট করে কাটা ঘাসগুলা দেখে মনে হচ্ছে সবুজ কার্পেট বিছায় রাখা, তার উপর গার্ডেন সেট। হাতিলের শোরুম। ভিতরে সব জিনিসি ই অবলীলায় পছন্দ হয়ে যায়। এক আর্মি অফিসার সংগে সুন্দরী বউ আসলো, একটা একটা করে ফার্নিচার দেখিয়ে বিল দিয়ে দ্রুত চলে গেলো। আমরা তখনও দাম দেখেই চলছি, মনটা খুব খারাপ হলো, ভাবলাম একদিন আমিও এমন হবো। দাম দেখবো না, জিনিস পছন্দ হলে বিল দিয়ে চলে যাবো।

পনেরো বছর পর নিজের সংসার পাতবো, ঠিক করলাম পুরান সব ফ্যাটি (ধাবড়া) জিনিস বাদ, সব স্লিম জিনিস থাকবে সংসারে। তাই শ্বশুরবাড়িতে পুরান মোটা খাট, সোফা, মোটা টিভি, মোটা এসি, মোটা আল্মিরা সব ফালায় শুন্য হাতে চলে এলাম।
সেই হাতিল!! একটা খাট, একটা ম্যাট, একটা আলমিরা দামের সাথে পছন্দের অনেক কষ্টে সমন্বয় করে কিনলাম কিন্তু টাকা শেষ। সংসারের আরেকটা দরকারি জিনিস বাদ পড়ে গেলো, তা হলো টিভি। ছোট বাচ্চা ঘরে থাকলে টিভি ছাড়া চলা মুস্কিল।

আমার শ্বশুরবাড়ী টিভির আ্যান্টিক কালেকশান, সবাই পুরান মডেল টিভি ফালায় চলে যায়, এমন কি ভাড়াটিয়া পর্যন্ত, ভাড়া দিতে না পারলে টিভি ফালায় পালায় যায়। কেন বাবা টিভিটা নিয়াই যা। তা না ওরাও মডেল চেঞ্জ করতে চায়। যাই হোক, শ্বশুর বাড়ি থেকে নিজেদের টিভি কয়দিনের জন্যে আনা হলো। বিশ্বকাপ চলছিল তখন। তাই টিভি খুব জরুরী।

এরপর আস্তে আস্তে একে একে জিনিস আসতো আর আমার বাচ্চার সে কি আনন্দ।

জামাকাপড় এর ব্যাপারে আমাদের অলিখিত চুক্তি, আমি বাচ্চা, জামাই এর কাপড় কিনবো, আর জামাই আমার। আপাত দৃষ্টিতে আমার লস মনে হইলেও লাভ সবসময় আমার। আমি আট হাজার টাকার জামা কিনলে, বাচ্চা, তার বাপ ৮০০ টাকার সার্ট কিনে। আমার জামাইয়ের তো ‘সেল ‘দেখলেই চোখ চকচক করে। যতই বলি, ‘টাকা আমার তোমার সমস্যা কি?’। তার ওইসব গায়ে লাগে না। বাচ্চার দামী কিছু কিনতে পারিনা, সে ব্যাপারে তার যুক্তি, ছেলে দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু আমার ব্যাপারে হিসাবের বালাই নাই। এইটাও একটা মিডল ক্লাশ সেন্টিমেন্ট। বউকে সাজায় রাখা। বাইরে থেকে সবাই যাতে ভাবে, বাহ না জানি কত বড়লোকের বউ।!!

কিন্তু আমার মানসিকতাও তো তেমনি, তাই ডি ডি বা ভাসাভি তে শুধু যাই আর দামের ট্যাগ দেখে বলি পছন্দ হয়নি। মনে মনে ভাবি, কোটিপতি হলেও কখনও এইসব কিনবো না।

বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রোগ্রাম থাকে, যেখানে ফ্যামিলি আলাউড না, সেইসব জায়গা আমি আ্যভয়েড করি, আর যদি না পারি তাহলে, বাসায় এসে ওদের নিয়ে বাইরে খাওয়াই। আমার জামাই, এ ব্যাপারে আমার চেয়েও এগিয়ে সে, প্যাকেট নিয়ে চলে আসে। একটা পেলে বাচ্চা, দুটা পেলে তার মা, তিনটা পেলে আমি। না খেয়েই নিয়ে আসে।

মায়া মমতা এই ক্লাশে সবচেয়ে বেশি। মা, বাবা, ভাইবোনের প্রতি দরদ এই ক্লাশেই সবচেয়ে বেশি বলে আমার ধারণা। জানিনা, অন্য ক্লাশের অনুভুতি আমার জানা নাই।

তবে কাছ থেকে কিছু উচ্চবিত্ত নিকট আত্মীয় দেখেছি, এদের বাচ্চাদের মধ্যে আমি পাওয়ার যে একটা আনন্দ আছে, তা কখনও দেখিনি। বাবা মা কে বিভিন্ন পার্টি ফাংশানে ব্যাস্ত থাকতে নিজে চোখে দেখেছি।

ধর্মীয় ধ্যান, ধারনা, আচার আচরন, রীতিনীতি মানার ব্যাপারেও মধ্যবিত্তরাই এগিয়ে আমার ধারনা। মধ্যবিত্ত সমাজের সবচেয়ে বেশি চর্চা হয় আচার আচরন, অন্যের প্রতি সন্মানবোধ এদের বেশি, কারণ এরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে।

উচ্চ বিত্তে যাবার কোন সম্ভাবনা আমার নাই, নিম্নবিত্তে কখন কে যাবে বলা যায় না। তবে সবচেয়ে বড় কথা আমি আমার নিজের এই বৃত্তের বাইরে যেতে চাই না। টক, মিষ্টি, ঝাল, দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, বেদনা ভরা বৈচিত্র্যময় মধ্যবিত্তেই সারাজীবন বাস করতে চাই

©মিথিলা ফেরদৌস
সংগৃহীত ফেসবুক ওয়াল থেকে

Print Friendly, PDF & Email