যেভাবে বিজয় এল

273

দেশদর্পণ ডেস্ক : দুইশ’ বছরের শাসন শোষণ শেষে বিদায়কালে ব্রিটিশরা ধর্মীয় দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত করে যায়। জন্ম নেয় দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। দুই খণ্ডে বিভক্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রের উৎপত্তির পর পরইৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (পূর্ব বাংলা) ওপর শোষক হিসেবে আবির্ভূত হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক শ্রেণি। তাদের হঠকারিতা, অদূরদর্শিতা এবং অবিমৃশ্যকারীতার কারণে দু’অঞ্চলের মধ্যে তৈরি হয় ভেদ রেখা এবং বৈষম্যের বেড়াজাল।

আমাদের প্রথম জাতীয় আন্দোলন ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা যখন জোর করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বানাতে চাইল, বাঙালিরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। দেশের অধিকাংশ মানুষই বাংলায় কথা বলে, স্বাভাবিকভাবেই বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার কথা। অথচ, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে উল্টো বাঙালিদেরই তাজা তাজা প্রাণ ঝরাতে হলো।

পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর শোষণ, বঞ্চনা আর অবহেলা চরম আকার ধারণ করলে প্রতিবাদ ক্রমে অগ্নিগর্ভ হতে থাকে এ অঞ্চল। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, লাহোরে পাকিস্তানের সবগুলো রাজনৈতিক দল নিয়ে একটা কনফারেন্স হল। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি ঘোষণা করলেন। এই ৬ দফা ছিল বাঙালির প্রাণের দাবি; ৬ দফা বাস্তবায়িত হলে দুই পাকিস্তানের মধ্যে এই বৈষম্য আর থাকতই না। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে এই ৬ দফা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে তারা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভকারী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে টালবাহনা শুরু করে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী। ফলে ক্ষোভে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান। একাত্তরের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ জনগণের স্বাধীনতার স্পৃহাকে প্রবল করে তোলে। ঢাকা যখন অগ্নিগর্ভ, তখন পাকিস্তানি শাসকচক্র আমাদের মুক্তির স্পৃহাতে দমনের পথ বেছে নেয়। রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার মাধ্যমে জন্ম দেয় ২৫ মার্চের কালরাতের। এরপরই চূড়ান্ত হয়ে যায় আমাদের পৃথক পথচলার যাত্রা।

আরও পড়ুন: বিজয়ের উল্লাসে মাতামাতি

২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় চূড়ান্ত লড়াই, মহান মুক্তিযুদ্ধ। জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনী সংগঠন সমাপ্ত হল। প্রধান এম এ জি ওসমানীকে মন্ত্রীর সমান ক্ষমতা দেওয়া হল। তার অধীনে মুক্তিবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ হলেন লে. কর্নেল আব্দুর রব, ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার, আর অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অফ স্টাফ হলেন মেজর এ আর চৌধুরী। যুদ্ধের সুবিধার্থে পুরো দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হল; প্রত্যেক সেক্টরে পাকিস্তান আর্মি থেকে এসে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়া অফিসারদের থেকে একজনকে কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হলো। এর বাইরে গঠন করা হলো তিনটি ব্রিগেড।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী কতোগুলো কৌশল ঠিক করেছিল। তার মধ্যে প্রধান ছিল দেশে প্রচুর গেরিলা যোদ্ধা পাঠানো, আচমকা গেরিলা আক্রমণে পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখা, অতর্কিত আক্রমণে কাবু করে ফেলা। গেরিলাদের মূল লক্ষ্যগুলো ছিল- পাকিস্তানি সেনাদের যতো বেশি সম্ভব রেইড ও অ্যাম্বুশ করা; পাওয়ার স্টেশন, রেললাইন, গুদাম নষ্ট করে পাকিস্তানিদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম নষ্ট করা; ব্রিজ-কালভার্ট, তেল ডিপো, ট্রেন, লঞ্চ-জাহাজ ধ্বংস করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনির চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া ইত্যাদি।

দীর্ঘ নয মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকালে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. কে নিয়াজী হাজার হাজার উৎফুল্ল মানুষের সামনে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। প্রায় ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্ববৃহৎ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান। দলিলে স্বাক্ষর করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরাজয় মেনে নেয়, নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করে ৯০ হাজার পাকিস্তানি সেনা।

পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের এই ঐতিহাসিক দলিলটি স্বাক্ষরিত হয় রমনার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান), ৪টা ১ মিনিটে। দলিলে স্বাক্ষর করলেন বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর পক্ষে কমান্ডার-ইন-চিফ লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, আর যুদ্ধরত পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী। ঐতিহাসিক সে ঘটনার সাক্ষী হিসেবে সেখানে আরো কে কে ছিলেন? বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ছিলেন তখনকার আমাদের বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার কমোডর এ কে খন্দকার, ভারতের পক্ষে সে দেশের তখনকার পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অফ স্টাফ লে. জেনারেল জ্যাকব রাফায়েল জ্যাকব, আর পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় পাকিস্তানি নেভির কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরীফ ও পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল প্যাট্রিক ডি কলাঘান।

দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজী নিঃশর্তে পরাজয় মেনে নিলেন, বাংলাদেশও স্বাধীন হয়ে গেল। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে যুদ্ধ করতে থাকা ৯০ হাজার পাকিস্তানি সেনা যুদ্ধবন্দী হিসেবে স্বীকৃত হল। ওরা যদি বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে, তবে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীর সকল অধিকারই ওরা পাবে। পাকিস্তানি সকল সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী-ই যুদ্ধবন্দীর মর্যাদা পাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একসঙ্গে এত সৈন্য আর কোথাও আত্মসমর্পণ করেনি।

দলিলে স্বাক্ষর হয়ে গেলে, মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, ভারতের বেতার কেন্দ্র আকাশবাণীসহ পৃথিবীর নানা রেডিও-টেলিভিশনে সে খবর প্রচার হতে শুরু করল; বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, পাকিস্তান মুক্তিবাহিনী আর ভারতের সেনাদের যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছে। অবশ্য ভারতের সেনাবাহিনী বেশিদিন যুদ্ধ করার সুযোগই পায়নি। ওরা আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ১২ দিনের মাথায়-ই যে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করলো!। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষের বহু আকাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও সারা দেশে সব পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণ করাতে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত লেগে যায়। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দিনই সপ্তম নৌবহর প্রবেশ করে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ প্রান্তে। কিন্তু বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের দখল থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত।

আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক দলিল

পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশি যৌথ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে, পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সকল সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।

এই দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে, তা আত্মসমর্পণের শর্তের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে, এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণের শর্তাবলির অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন, এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেওয়া হবে।

লেখক: ব্লগার/ অনলাইন একটিভিস্ট

দেশদর্পণ/আরএইচ

Print Friendly, PDF & Email