অপসাংবাদিকতার জঞ্জাল দূর করতে সচেষ্ট হই

117

মফস্বল সাংবাদিকতায় ২৫ বছর

এস আর সেলিম, সাংবাদিক

সেই ১৯৯৪ সালে ছাত্রাবস্থায় স্থানীয় পত্রিকায় টুকটাক খবর লেখালেখি শুরু আমার। অর্থাৎ মফস্বল সংবাদকর্মী হিসেবে কলম ধরার বয়স দাঁড়াল ২৫ বছর। যা একেবারেই কম সময় নয়। বরং নিজ বয়সের অর্ধেকের বেশি সময়ই। শখের বসে এই পথে এসে ধীরে ধীরে নেশায় আসক্ত এবং শেষমেষ এক রকম পেশাতেই পরিণত। তবে শুরু থেকে এ পর্যন্ত কখনোই নিজের ঢোল নিজে পেটানোর প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু অনিচ্ছা সত্বেও আজ একটু পেটাতে হচ্ছে। অবশ্য সে রকম কোনো অনুষজ্ঞও আমার ক্ষেত্রে নেই। শুরুর দিকে খবরের পেছনে প্রচুর ওয়ার্ক করেছি। খবরের প্রয়োজনে দিন-রাত সমানে চষে বেড়িয়েছি এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। কিন্তু এখন আর সেই দৌড়ঝাঁপ ভাল লাগে না। ডিজিটাল যুগ ঘরে বসেই সব খবর মেলে। ছুটোছুটি না করলেও চলে। তবু বিশেষ খবরের ক্ষেত্রে ছুটতেই হয়। কিন্তু ব্যাপারটি আসলে তাও নয়। সমস্যা অন্য জায়গায়।

সে যাই হোক, সেই সময়ে দৌলতপুর অঞ্চলে চলতো পাবলিক পরীক্ষায় নকলের মচ্ছব। কুষ্টিয়া শহর ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে অনেকে নকলের সুযোগ নিতে এখানকার বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এসব পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতেন। নতুন কিংবা শিক্ষানবিশ ‘সংবাদকর্মী’ হিসেবে সে সময় সাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ বিশেষ জায়গাগুলোতে বিচরণের আগ্রহটা একটু বেশিই ছিল। কৌতূহল মেটাতে সে সব জায়গায় যেতামও। এ রকম প্রবেশ নিষিদ্ধ স্থানগুলোর মধ্যে পরীক্ষা কেন্দ্র এবং ভোট কেন্দ্র ছিল মোটামুটি উল্লেখযোগ্য।

বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র ঘুরে রাজনৈতিক নেতাদের রক্তচক্ষু ও নানা প্রতিকূল অবস্থা উপেক্ষা করে পাবলিক পরীক্ষায় নকলের বহু এক্সক্লুসিভ ছবি তুলেছি। সেই ছবিসহ স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় রিপোর্ট করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছি। নকল সরবরাহ ও বেঞ্চের ওপর নকল রেখে লেখার ছবি দিয়ে ঢাকার একটি দৈনিকের পেছন পাতায় বক্স আকারে লিড করা হয়েছিল। হেডিং ছিল, ‘দৌলতপুরে এসএসসিতে নকলের হিড়িক, প্রশাসন নীরব’। কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানো ওটা ছিল কোনো জাতীয় দৈনিকে বাই নেমে আমার প্রথম নিউজ। যা দেখে দারুণ পুলকিত হয়েছিলাম। পরে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন। আলাদাভাবে আসেন জেলা প্রশাসকও। কিন্তু তারা ফিরে যাওয়ার পর আবার সেই হযবরল অবস্থা দেখা দেয়।

তবে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে নকল প্রবণতার লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হন। প্রতিমন্ত্রী অনেকটা আকস্মিকভাবে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে নকল বিরোধী অভিযান চালাতেন। একদিন ইউএনও নজরুল ইসলামের কাছে খবর এলো, প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন মথুরাপুর কেন্দ্রে এসেছেন। আমি তখন ইউএনওর সাথে দৌলতপুর কেন্দ্রে ছিলাম। তিনি প্রতিমন্ত্রীর আসার কথা তাৎক্ষণিক না জানিয়ে কিছুটা মজা করেই বললেন, ‘চলেন মথুরাপুর কেন্দ্রে। আজ আপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর আছে।’ চললাম ইউএনওর সাথে তার তখনকার সবুজ রঙের জিপ গাড়িতে মথুরাপুরের উদ্দেশে। কিন্তু বিধিবাম। সেখানে পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগেই মন্ত্রীর হেলিকপ্টার উড়াল দেয় অন্য কোনো কেন্দ্রে।

পরে ইউএনও নজরুল ইসলাম (বর্তমানে ডাইরেক্টর, পাওয়ার ডিভিসন) কেন্দ্র সচিবের কাছ থেকে মন্ত্রী কতক্ষণ অবস্থান করেছেন, কী বলেছেন, কজনকে বহিস্কার করেছেন ইত্যাদি বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। আমিও নোটডাউন করছিলাম। ওইদিন পরীক্ষার শেষ পর্যন্ত ইউএনও সেখান থেকে আর নড়লেন না। ততক্ষণে আমি ওখানে একপাশে বসেই ‘প্রতিমন্ত্রী মিলনের আকস্মিক মথুরাপুর কেন্দ্র পরিদর্শন, তল্লাশি করলেন বাথরুমও’ শিরোনামে বিশদ একটি নিউজ রেডি করলাম। কিন্তু উপস্থিত কাউকে বুঝতে দিলাম না। পরের দিন দৈনিক আন্দোলনের বাজার পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে সেটি প্রকাশিত হয়। নিউজটি দেখে ইউএনও নজরুল ইসলাম বেজায় খুশি হলেন। আমাকে বাহবা দিলেন। তবে কারো বাহবা পেতে কিংবা কাউকে তেল মারার জন্য নয়। কর্তব্যের জায়গা থেকেই গতানুগতিক ধারার বাইরে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে সেই নিউজটি করেছিলাম।

অত্যন্ত সাহসি উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ এই কর্মমকর্তা প্রতিদিন রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত উপজেলা ক্যাম্পাসের বাইরে প্রধান সড়কে নিয়মিত হাঁটতে বেরোতেন। বাজারের পাশেই বাড়ি হওয়ায় আমাকে ডেকে নিতেন। দুর্গা পূজার সময় এশার নামাজ পড়ে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে আমাকে সঙ্গে নিতেন। ব্যক্তিগত কাজ না থাকলে যেতাম। একদিন সবচে’ বড় পূজামণ্ডপ আল্লারদর্গায় যাওয়ার সময় ওই বাজারের ঠিক মাঝখানে ইট হাতে একজন মদ্যপ ব্যক্তি আচমকা ইউএনওর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ইট মারতে উদ্যোত হন। জিন্স প্যান্ট, টিশার্ট ও কেডস পরা দাপুটে ইউএনও নজরুল সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে ওই মদ্যপ ব্যক্তিকে চড় থাপ্পর মেরে থানায় নেয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন। সে সময় বাজার কমিটির লোকজনের বিশেষ অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেন তিনি। ‘ইট হাতে ইউএনওর গাড়ির সামনে মদ্যপ ব্যক্তি’ শিরোনামে এটাও আমার কাছে একটি নিউজের আইটেম হলো। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ইউএনওর গাড়ি যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে সেখানে একটি সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছিল। এ কারণে ওই ব্যক্তি গাড়ি ভাঙতে উদ্যোত হয়েছিলেন।

ইউএনও নজরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামগুলোতে আমন্ত্রণ করতেন। সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনে সমতা বজায় রাখতেন। এছাড়া প্রতিপক্ষ হয়ে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। তিনি আমাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে খেলায় স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। হাসি আড্ডা ছাড়াও ভীষণ মজার একজন মানুষ তিনি এবং একই সাথে অন্যরকম ব্যক্তিত্ব সম্পন্নও বটে। তার সাথে খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমার। এ কারণে বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলাপ আলোচনা করতেন। সর্বোপরি তিনি আন্দোলনের বাজারে প্রকাশিত আমার নিউজ এবং পত্রিকাটির আধুনিকায়নের প্রশংসা করতেন। তিনি আগ্রহ দেখানোয় একদিন তাকে সম্পাদক মনজুর এহসান চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ করিয়েছি। সেদিন মন্ত্রী পরিষদ সচিব আকবর আলি খানের মিটিং শেষ করে ফেরার পথে মজমপুরে পত্রিকা অফিসে গিয়ে ওই সাক্ষাৎ করেন তিনি।

বর্তমানে খুব সম্ভবত বরগুনার জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন। এক সময় দৌলতপুরের এসি ল্যাণ্ড ছিলেন। নকল প্রবণ পাবলিক পরীক্ষায় তিনি ছিলেন পরীক্ষার্থীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। একবার এইচএসসি পরীক্ষায় আনোয়ার হোসেন শতাধিক পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেন। সে সময় বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা চলছিল। তো সেবার ক্রিকেটের ভাষায় নিউজের হেডিং দিলাম, ‘এসি ল্যাণ্ড আনোয়ারের সেঞ্চুরি!’ আর নিউজের ভেতরে ছিল কীভাবে কিসের সেঞ্চুরি তার বিস্তারিত বর্ণনা।

তখন আজকের মতো অবাধ তথ্য প্রবাহের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ছিল না। ১৯৯৯ সালের ১৬ ফ্রেব্রুয়ারি সন্ধ্যা। তখনকার ইউএনও জাহাঙ্গীর মোল্লার ছোট ভাই (নাম মনে পড়ছে না) খবর দিলেন, উপজেলার কালিদাসপুরে সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে দুর্বৃত্তদের ব্রাসফায়ারে জাসদ সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদসহ পাঁচ জাসদ নেতা নিহত হওয়ার। তাৎক্ষণিক ছুটে গেলাম থানায়। সেখান থেকে নিশ্চিত হলাম কাজী আরেফের মরদেহ দৌলতপুর হাসপাতালে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে গিয়ে দেখি বহু মানুষ সেখানে ভিড় করেছে। ভিড় ঠেলে গেটের ভেতরে ঢুকে এসআই লোকমান ভাইকে কাজী আরেফের সুরতহাল রিপোর্টের প্রস্তুতি নিতে দেখে পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। লোকমান ভাই কাজী আরেফের হাত থেকে সিলভার কালার ডায়ালের হাত ঘড়িটি খুলে আমাকে ধরে রাখতে বললেন। ওনার মাথায় বাঁধা রক্তাক্ত গামছা খুললেন। মাথার এক পাশ থেকে বুলেট ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় মাথার ঘিলু দেখা যাচ্ছিল। রক্তে পুরো শরীর ভিজে গিয়েছিল। পরে ওনার গায়ের পাঞ্জাবি খোলার সময়, নিউজ দিতে হবে তাই এসআই লোকমান ভাইয়ের কাছে ঘড়িটি জমা দিয়ে বাইরে বেরোলাম।

সেখানে অপেক্ষমান কালিদাসপুরের ঘটনাস্থলের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে যতদূর সম্ভব জানার চেষ্টা করলাম। জয়রামপুরের জাসদ নেতা খলিল মেম্বার ঘটনা প্রত্যক্ষতার কথা জানালেন। পরে পুনরায় থানা থেকে নিহতদের নাম পরিচয় নিয়ে টিএ্যান্ডটি অফিসে গেলাম। এই প্রথম এতবড় একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে নিউজ করতে ভীষণ এক্সাইটেড ছিলাম। সেখানে বসে তাড়াহুড়ো করে কোনোমতে একটি নিউজ রেডি করে এনালগ টেলিফোনের মাধ্যমে সেদিন রাত ১০টায় ঢাকায় এই হত্যাকাণ্ডের খবর দিয়েছি। পরের দিন ফ্যাক্সে ফলোআপ দেই।

পরে রাতেই আবার থানায় গিয়েছি আপডেট খবর ও মামলা প্রসঙ্গে জানতে। ততক্ষণে নিহত পাঁচজনের মরদেহ থানায় আনা হয় এবং ব্যাডমিন্টন কোটে ভ্যানের ওপর সারিবদ্ধভাবে মৃতদেহগুলো রাখা হয়। সে সময় ওসির কক্ষে গেলাম। ভেতরে ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি লুৎফুল কবির। ওসি ইছাহাক আলী উঠে এসে বললেন, ‘ডিআইজি স্যার অাছেন। এখন কিছু বলা যাচ্ছে না। আমি মামলার বাদী হচ্ছি। কাল সাংবাদিকদের বিস্তারিত ব্রিফিং করা হবে।’ এরপর আর দেরি না করে উপজেলায় চলে আসলাম।

গভীর রাতে প্রেসক্লাবে এসে সিনিয়র সাংবাদিক শহিদুল ভাইয়ের সাথে দেখা। সে সময় তিনি বিবিসি প্রতিনিধিকে টেলিফোনে এই হত্যাকাণ্ডের খবর পরিবেশন করছিলেন। খবর দেয়া শেষ হলে শহিদুল ভাইয়ের সাথে এ নিয়ে দীর্ঘ সময় আলাপ করি। দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর চরমপন্থি অধ্যুষিত এ অঞ্চলে কয়েকটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। সেই মোতাবেক ঘটনাস্থল কালিদাসপুর ও শ্যামপুর পুলিশ ক্যাম্প উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ওই উদ্বোধন অনুষ্ঠানের নিউজ কভার করতে গিয়ে মন্ত্রী নাসিম ও আইজিপি এওয়াইবি সিদ্দিককে বহনকারী কপ্টারে ওঠার অভিজ্ঞতাও হয়েছিল।

বলা বাহুল্য সে সময় হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া এ উপজেলায় এত ‘সাংবাদিকের’ ছড়াছড়ি ছিল না। সুতরাং সব মহলেই সাংবাদিকদের আলাদা একটা কদর ছিল। প্রশাসনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি এবং অপরাপর সবাই সাংবাদিকদের যথাযথ মূল্যায়ণ করতেন। তাদের ভিন্নমাত্রার গুরুত্ব বেশ এনজয় করতাম। আর এখন অনেকটা এর উল্টো অবস্থা। ইদানিং অনেকেই সাংবাদিকদের বিষোদ্গার করেন। অনেকে মনে মনে আবার কেউ প্রকাশ্যেই সাংবাদিকদের ‘সাংঘাতিক’ অাখ্যা দিয়ে উপহাস করতেও দ্বিধা করেন না।

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আগে যেমন সবখানে স্বাচ্ছন্দবোধ করা যেত। এখন কেমন যেন লজ্জিত হতে হয়। কিন্তু মানুষের মধ্যে কেন এই সাংবাদিক বিমুখ অবস্থা। নিশ্চয় এর কারণও বিদ্যমান। উত্তরটাও খুব সহজ। সময়ের বিবর্তনে বেশুমার অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় ও কতিপয় নাম সর্বস্ব জাতীয় পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতা জেঁকে বসায় এ ধরনের বিমুখ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতেও বিব্রত বোধ করি। বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া এই পরিচয়টাকে গোপন করে রাখি।

মফস্বল সাংবাদিকতায় দীর্ঘ ২৫ বছরের পথ পরিক্রমায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাও মনে পড়ছে আজ। সম্ভবত ১৯৯৮ সাল। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশাল জনসভা চলছিল মথুরাপুর পিপলস ডিগ্রি কলেজ মাঠে। বেগম জিয়া মঞ্চের বাঁ দিকে ডায়াসে যখন বক্তব্য রাখছিলেন তখন ইনকিলাবের ফটো সাংবাদিক লুৎফর রহমান বেনু, লোকসমাজের ফটো সাংবাদিক হানিফ ডাকুয়া এবং আরো অনেকে মঞ্চের ডান পাশ থেকে সামনের জনগণসহ একই ফ্রেমে বেগম জিয়ার ছবি নিচ্ছিলেন। তাদের ছবি নেয়ার পর আমি ডান দিক থেকে ছবি না নিয়ে একটু আলাদাভাবে নেয়ার জন্য মঞ্চের বাঁ দিকে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর ছোট ভয়েস রেকর্ডারটা অন করে পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম।

বেগম জিয়ার ডায়াস থেকে মাত্র এক ফুট দূরে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা ধরেছি তিনি বক্তৃতাকালে এ পাশে তাকিয়ে আঙ্গুুল উঁচু করলেই ক্লিক দেব মনে করে।

ঠিক এমন সময় বেগম খালেদা জিয়ার এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমার হাত চেপে ধরে সেখান থেকে নামিয়ে মঞ্চের পেছনে নিয়ে গেলেন। পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। পরিচয়পত্র দেখানোর পর বললেন, ‘ম্যাডামের নিরাপত্তাজনিত কারণে এ পাশ থেকে ছবি তোলার কোনো সুযোগ নাই। আপনি অনেক কাছাকাছি চলে গেছেন। দ্বিতীয়বার এই কাজটা করলে আপনার সমস্যা হয়ে যাবে।’

এ সময় বিএনপি নেতা অ্যাড. রমজান ভাই সেখানে এসে কী হয়েছে জানতে চান এবং আমার পরিচয় জানিয়ে তাকে বলেন, সমস্যা নাই। ও আমাদের ছোট ভাই সাংবাদিক। তখন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমাকে বললেন, প্রয়োজন মনে করলে ডান দিকের নির্দিষ্ট স্থান থেকে ছবি নিয়ে নিচে গিয়ে নির্ধারিত আসনে বসুন।

কথিত ক্রসফায়ার, অ্যানকাউন্টার কিংবা বন্দুকযুদ্ধে দৌলতপুর উপজেলায় এক সঙ্গে তিন কুখ্যাত ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনাটি ছিল বেশ আলোচিত। দুর্গম চরাঞ্চলে পুলিশের এক রাতের অভিযানে চরাঞ্চলের ত্রাস সাফাতসহ প্রায় ১০-১২ জন আটক হন। পরের দিন ওসি আব্দুল হাই ওই দুর্র্ধষ ব্যক্তিদের আটকের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।
আরও পড়ুন: একাদশে শিখেছি, দ্বাদশে শেখাবো: মোমিন মেহেদী

পরে ব্যক্তিগত আলাপকালে ওসির ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ কথায় বুঝতে বাকি ছিল না রাতে কিছু একটা ঘটবে। তবে একই সাথে তিনজন যাবে তা ধারণাতেই আসেনি। আটককৃতদের ছবি দিয়ে ‘পুলিশের অভিযানে চরাঞ্চলের ত্রাস সাফাত সহযোগিসহ আটক’ শিরোনামে খবর বের হলো। আর ওই দিনই খুব সকালে খবর এলো, সাফাতসহ তিনজন ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার। ফলে পরের দিনের পত্রিকায় শিরোনাম হলো, ‘দৌলতপুরে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ : চরাঞ্চলের ত্রাস সাফাত ও তার দুই সহযোগী ক্রসফায়ারে নিহত।’

সাংবাদিকতায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং দল নিরপেক্ষ থাকার সুবাধে ২০০১ সালের অস্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত ভিজিলেন্স ও অবজারভেশন টিমের সদস্য মনোনীত করা হয়েছিল আমাকে। সহকারী রিটার্নিং অফিসার ইউএনও আনোয়ার হোসেন সাত সদস্যের সেই টিমের আহ্বায়ক ছিলেন। উপজেলা প্রশাসনের চারজন কর্মকর্তা ছাড়াও সাংবাদিক খন্দকার আবুল কালাম আজাদ এবং আমি ওই টিমের সদস্য ছিলাম।

কিন্তু দুঃখজনক সেই নির্বাচনে ভোটগ্রহণের আগের দিন হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ভোট কেন্দ্র ভিজিট করার জন্য তাদের সাথে যুক্ত হতে পারিনি। তবে রাতে ফলাফল ঘোষণার সময় ইউএনওর কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলাম। প্রাগপুর ও রামকৃষ্ণপুরের দিকে কয়েকটি কেন্দ্রের রেজাল্ট আসতে দেরি হওয়ায় বিএনপি প্রার্থী আহসানুল হক মোল্লাকে উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল।

তিনি বার বার কক্ষের বাইরে গিয়ে বারান্দায় পায়চারি করছিলেন আর ঘন ঘন সিগারেট টানছিলেন। পরে বেসরকারিভাবে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হলে তবেই বিজয়ের হাসি মুখে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন চতুর্থ বারের মতো এমপি নির্বাচিত বিএনপির এই নেতা।

এক সময় যেখানেই খবরের গন্ধ পেয়েছি তাৎক্ষণিক ছুটে গিয়েছি। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নিয়মিত ফলোআপ করেছি। অনেক হুমকি ধামকি, বাধা বিপত্তির মুখোমুখি হয়েছি এবং এখনো হচ্ছি। তবু কলম থেমে থাকেনি। থামবেও না।
আরও পড়ুন: আবারও জঙ্গি সদস্যদের ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন রেজা

যদিও আজকের মতো কম্পিউটারের মাউস কীবোর্ড নয়, তখন নিউজ লেখায় ভরসা ছিল কাগজ আর কলমই। দীর্ঘ সময়ের এই সাংবাদিকতায় কী পেলাম আর কী পেলাম না সেই হিসেব করিনি কখনোই। বিগত ২৫ বছরে অর্জন বলতে মফস্বলের সাংবাদিক হিসেবে নিজের একটা পরিচয় দাঁড় করাতে পেরেছি এ টুকুই। আর বিসর্জন তো রয়েছে অনেক কিছুই।

নিজের নামের সাথে সাংবাদিক শব্দটা যুক্ত করতে যাদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছি তাদের কথা না বললেই নয়। যাদের মধ্যে রয়েছেন, দৈনিক বাংলাদেশ বার্তা সম্পাদক আব্দুর রশীদ চৌধুরী, দৈনিক আন্দোলনের বাজার সম্পাদক মনজুর এহসান চৌধুরী, দৈনিক দেশতথ্য সম্পাদক এসএম হালিমুজ্জামান, বার্তা সংস্থা এনএনবির জেলা প্রতিনিধি রেজাউল করিম, দৈনিক কুষ্টিয়ার কাগজ সম্পাদক নুর আলম দুলালসহ আরো অনেকে। যাদের প্রত্যেকের সাথে সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

অন্যদিকে আমার কাছেও অনেকে এসে সাংবাদিক হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এদের মধ্যে যাদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিল তা বোঝার সক্ষমতা থাকায় এ সম্পর্কে নেতিবাচক কথাবার্তা বলে তাদের বিদায় করেছি। আর যাদের মানসিকতা পছন্দ হয়েছে অর্থাৎ যার আন্তরিক ইচ্ছা রয়েছে এ রকম কয়েকজনকে মফস্বল সাংবাদিক হতে সাধ্য মতো সহযোগিতা করেছি। তাদের নাম নাই বা বলি।

অথচ আজকাল অসংখ্য অখ্যাত অনলাইন নিউজপোর্টাল ও সস্তা পত্রিকার ছড়াছড়ির কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি কিছু অর্থের বিনিময়ে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে ‘বড় সাংবাদিক’ বনে যাচ্ছেন। যারা নিউজ লেখা তো দূরের কথা একটা বাক্য গঠনেরও যোগ্যতা রাখেন না। তারা সাংবাদিকতায় আসতে না আসতেই নির্লজ্জের মতো নিজের ঢোল পেটানোর কাজটা করে যাচ্ছেন অবলীলায়। জড়িয়ে পড়ছেন অপসাংবাদিকতায়।

আর এদের খামখেয়ালিপনা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে গোটা সাংবাদিকতা এক রকম প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়। যদিও আমি ব্যক্তিগতভাবে এই তথাকথিত সাংবাদিক নামধারীদের কখনো হিসেবেই রাখি না। তার মানে আবার এটাও নয় যে, আমি বিরাট সাংবাদিক হয়ে গিয়েছি। মোটেও তা হতে পারিনি। শিখতে পারিনি তেমন কিছুই। শেখার চেষ্টায় আছি।

বিভিন্ন সময়ে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করে এসেছেন তাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলেই প্রত্যাশা করছি।

পরিশেষে বলবো, এই মুহূর্তে স্বঘোষিত ভুইফোড় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া খুব জরুরি। আসুন নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সবাই মিলে এদের বর্জনের মধ্য দিয়ে অপসাংবাদিকতার জঞ্জাল দূর করি। সাংবাদিকদের সম্পর্কে মানুষের মাঝে ইতিবাচক ধারণা অক্ষুণ্ন রাখতে সচেষ্ট হই।

লেখক: সাংবাদিক এস আর সেলিম

Print Friendly, PDF & Email