দলীয় ঐক্যবদ্ধতাসহ স্থানীয় উন্নয়নেই যশোরে আ.লীগের জয়

43

ইস্তেহার সন্তোষজনক না হওয়াসহ জামায়াত প্রীতিই বিএনপির ভরাডুবি!

বিশেষ প্রতিনিধি, যশোর : দলীয় ঐক্যবদ্ধতাসহ সারাদেশের সাথে স্থানীয় উন্নয়নেই যশোরে আওয়ামীলীগের জয়জয়াকর হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত প্রীতিসহ নির্বাচনে ঘোষিত ইস্তেহার সাধারণ ভোটাদের কাছে সন্তোষজনক না হওয়া এবং স্থানীয় দলীয় অধিকাংশ নেতাকর্মী মামলায় জড়িয়ে থাকায় নির্বাচনে বিএনপি সুবিধা করতে পারেনি। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর স্থানীয় জনগণ ও রাজনীতিবিদরা এসব মন্তব্য করেছেন।

যদিও বিএনপি নেতাকর্মিদের দাবি, ক্ষমতাসীনদের ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা, বোমা সন্ত্রাস, কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও পোলিং এজেন্ট বের করে দেয়াসহ ভোটের আগের রাতেই সন্ত্রাসীরা ভোট কেটে ক্ষমতাসীন প্রার্থীর ভোট বাক্স ভরার কারণ উল্লেখ করেছেন।

দেশের প্রাচীনতম জেলার একটি যশোর। ২০০১ সালের নির্বাচন বাদ দিলে বরাবরই যশোরের ৬টি আসনই আওযামীলীগের দখলে থাকে। এবারও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আওয়ামীলীগের ছয় জন প্রার্থীই বিপুল ভোটের ব্যবধানে জেলার ছয়টি সংসদীয় আসন নিজেদের দখলে রেখেছেন। ছয়টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ৩৭ জন প্রার্থী এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।

এর মধ্যে জামানত হারিয়েছেন আওয়ামীলীগের ছয় প্রার্থী ছাড়া বিএনপিসহ ৩১ জন প্রার্থী। এবারের অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মাঝেও ছিল ব্যপক আগ্রহ। বিচ্ছিন্ন হামলা, অভিযোগ ও ছয় প্রার্থীর ভোট বর্জনের মধ্যে দিয়ে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়। তবে, এত বেশী ভোটের ব্যবধানে আওয়ামীলীগের জয়লাভ নিয়েও সমালোচনা কম হয়নি।

আরোও পড়ুন: বছরের শুরুতেই স্বর্ণের দাম বাড়ল

এদিকে, নির্বাচনের আগে আওয়ামীলীগের ঐক্যবদ্ধতা নিয়েও ছিল ভীতকর পরিস্থিতি। জেলার সব সংসদীয় আসনেই প্রকট ছিল আওয়ামীলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। মনোনয়ন প্রত্যাশি ছিল অর্ধশতাধিক দলীয় নেতা। এর মধ্যে প্রভাবশালী প্রার্থী হিসাবে ছিলেন জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদার। তবে, নির্বাচনের নৌকা প্রতীক বিজয়ের লক্ষে তার ছিল বলিষ্ট ভুমিকা।

যশোর জেলা আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ হাসান বিপু বলেন, মোটামুটি যশোর জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদার দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় জেলার নেতাকর্মিরা চরম হতাশায় পড়েন। তবে, শাহিন চাকলাদার দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশসহ নৌকা বিজয়ের লক্ষে সকল কোন্দল ভেদা ভেদ ভুলে দলকে সুসংগঠিত করে মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের সাথে নিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করে ভোটারদের নিকট ভোট প্রার্থনা করেন। এতে করে দলীয়সহ সাধারণ ভোটাদের সকল সংশয় দূর হয়। এবং দলীয় প্রতীক নৌকা বিজয় সুনিশ্চিত হয়।

ইস্তেহার সন্তোষজনক না হওয়াসহ জামায়াত প্রীতিই বিএনপির ভরাডুবি কারণ উল্লেখ করে এ নির্বাচন বিষয়ে বেনাপোলের বাসিন্দা সুকুমার দেব নাথ বলেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখার প্রত্যয়েই জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট প্রদান করেছেন।

এদিকে, এবারের ভোটে যশোর জেলার মোট ২০ লাখ ৯২ হাজার ৪শ ৭২ জন ভোটারের মধ্যে ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৫৩৪ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। যশোরের রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আওয়াল স্বাক্ষরিত প্রাথমিক বেসরকারি ফলাফলে এ তথ্য পাওয়া যায়। যা এবার গড়ে ৮৩ দশমিক ২০ শতাংশ ভোট পড়েছে। এরমধ্যে যশোর-১ (শার্শা) আসনে ভোট পড়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৪৫টি। যা মোট ভোটের ৮৩ দশমিক ৪৮ ভাগ। যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬২২ ভোট পড়েছে। যা মোট ভোটের ৮৫ দশমিক ৭৩ ভাগ। যশোর-৩ (সদর) আসনে ৪ লাখ ১ হাজার ১৩৬ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। যা মোট ভোটের ৭৬ দশমিক ৬৫ ভাগ। যশোর-৪ (অভয়নগর-বাঘারপাড়া) আসনে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৩শ ৩৮ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। যা মোট ভোটের ৮১ দশমিক ৭৪ ভাগ। যশোর-৫ (মণিরামপুর) ২ লাখ ৭৫ হাজার ৭৪ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন। যা মোট ভোটের ৮৬ দশমিক ২১ ভাগ। যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৮৫ জন ভোট প্রদান করেছেন। যা মোট ভোটের ৮৫ দশমিক ২৩ ভাগ।

এক প্রশ্নের উত্তরে রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক আবদুল আওয়াল বলেন, এবারের নির্বাচনে ছয় স্তরের নিরাপত্তা বলয় ছিল। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। ফলে সর্বস্তরের মানুষ নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন।

এ নির্বাচন নিয়ে জেলার চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের তৌহিদুল ইসলাম এলিট বলেন, উন্নয়নের ধারা অব্যহত রাখতে গ্রাম বাংলার আপমর জনতা আবারো নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে শেখ হাসিনাকে জয়যুক্ত করেছেন। অন্যদিকে, বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীসহ তাদের সমর্থকগণ দেশে গণতন্ত্র অবরুদ্ধ ও দেশব্যাপী বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের ওপর হামলার কথাসহ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির জন্য ধানের শীষে ভোট দেয়ার অনুরোধ করে ভোটারদের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করলেও জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তবে, ভোটের ফলাফল প্রকাশের আগেই বিএনপিসহ কয়েকজন প্রার্থী অনিয়ম ও কারচুরি অভিযোগ এনে যশোরের ৬টি আসনের ছয় প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ভোট কেন্দ্র দখল, ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা, বোমা সন্ত্রাস, কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও পোলিং এজেন্ট বের করে দেয়ার অভিযোগ এনে তারা এই ঘোষণা দেন।

এরা হলেন, যশোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মফিকুল হাসান তৃপ্তি, যশোর-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আবু সাঈদ মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন, যশোর-৪ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জহুরুল হক জহির ও এনপিপির প্রার্থী মুহম্মদ আলী জিন্নাহ এবং যশোর-৫ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী কামরুল হাসান বারি ও ধানের শীষের প্রার্থী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস। নির্বাচন প্রত্যাখ্যান ও বর্জনের ঘোষণার পাশাপাশি তারা এই আসনগুলোতে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানান।

তবে, যেহেতু নির্বাচন পরবর্তি যশোরসহ দেশের পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। সেকারণে ধরে নেয়া যায় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হয়েছে মন্তব্য করে বলেন দেশের উন্নয়নের ধারা যের অব্যহাত থাকে।

দেশদর্পণ/একে/এসজে

Print Friendly, PDF & Email